গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের পথে
পর্ব ১:
“গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন ট্রিপের শুরুর গল্প”
(রেনো পর্যন্ত যাত্রা ও রাতের অভিজ্ঞতা)
“Bucket list” – মানে কি? গুগল স্যারের মতে, “বালতির তালিকা”! আর “road trip”? সেটাও নাকি “রাস্তা যাত্রা”! হায় রে! গুগল অনুবাদ যাই বলুক, আমার কাছে “bucket list” মানে সেই স্বপ্নগুলোর তালিকা, যেগুলো এক জীবনে না করলেই নয়। আর “road trip”? সেটা তো একটা আস্ত অনুভব—রাস্তায় চলা, জানালার বাইরে দিগন্ত ছোঁয়ার চেষ্টা, আর বন্ধু বা পরিবার নিয়ে দূরে কোথাও হারিয়ে যাওয়া।
আমার সেই তালিকার একেবারে ওপরের দিকে রয়েছে গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন। বহুদিন ধরেই মনে মনে ভেবেছি—একবার অন্তত চোখ মেলে দেখব এই প্রাকৃতিক বিস্ময়। একবার গনগনি গিয়ে সেই স্বপ্নটা কিছুটা পূরণের চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু সে তো যেন দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো!
২০২৩ সালে যখন পঞ্চমবারের মতো আমেরিকা আসার সুযোগ মিলল, তখন জামাতা সুরজিত আর কন্যা অনন্যা (মাম্পি) একেবারে হাতে তুলে দিল সেই স্বপ্ন ছোঁয়ার চাবিকাঠি। নিজেদের ব্যস্ত অফিস জীবনের মধ্যেও ওরা এমনভাবে গোটা ট্রিপটা প্ল্যান করল, যেন এটা ছিল ওদেরই বহুদিনের স্বপ্ন!
যাত্রা শুরু: ফ্রেমন্ট থেকে রেনো
তারিখ: ১৭ নভেম্বর, ২০২৩
সময়: সন্ধ্যা ৭টা
গন্তব্য: দশ দিনের রোড ট্রিপ—চারটি রাজ্য, একগুচ্ছ নতুন অভিজ্ঞতা!
সেদিন ছিল শুক্রবার, কাজের দিন। নাতনি সরগমের স্কুল, মেয়ে ও জামাইয়ের অফিস—সব শেষ করে সন্ধ্যাবেলা যখন বেরোলাম, তখন শুরু হয়েছে হালকা বৃষ্টি। আমেরিকায় বর্ষাকাল নেই—এখানে শীতকালেই বর্ষা!
রাস্তায় তখন অফিস ছুটির গাড়ির ভিড়। বেশ কিছুক্ষণ ধীরে ধীরে চলার পর ওকল্যান্ড পেরিয়ে গাড়ি গতি পেল। অন্ধকার, বৃষ্টি আর ক্লান্তি—এই তিনে মিলে সুরজিতের জন্য ড্রাইভটা চ্যালেঞ্জিং ছিল। ঘণ্টা দুই পর সরগমকে কিছু খাইয়ে নিতে থামা হলো ক্যালিফোর্নিয়ার রাজধানী স্যাক্রামেন্টোতে, একটা ম্যাকডোনাল্ডে।
রাতের ড্রাইভ: সিয়েরা নেভাডা পাড়ি
আবার রওনা। এবার শুরু হলো পাহাড়ি রাস্তা। বাইরে কিছুই দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু কানে তালা লাগা আর খুলে যাওয়া থেকে টের পাচ্ছি—আমরা উঠছি! সিয়েরা নেভাডা রেঞ্জ পেরোচ্ছি। ছয় হাজার ফুট উচ্চতায় উঠে গেলাম একসময়, এবং সেটা ছয় লেনের হাইওয়ে ধরে, ঘণ্টায় ১০০ কিমি গতিতে! দার্জিলিং-গ্যাংটকের সমান উচ্চতা পেছনে ফেলে দ্রুত এগিয়ে যেতে আমেরিকার হাইওয়ে এক অন্যরকম রোমাঞ্চ দিল।
থ্রিলার রাত: একা গ্যাস স্টেশন
রাত বাড়ছে, গাড়িতে তেলও শেষের পথে। থামলাম এক নির্জন গ্যাস স্টেশনে। জায়গাটা সিনেমার থ্রিলার দৃশ্যের মতো—চারপাশ ফাঁকা, একটা পুরনো দোকান, একজন বৃদ্ধা কেমন নিঃসঙ্গভাবে কাজ করছেন কাউন্টারে।
সুরজিত তেল ভরছে। এমন সময় আরেকটা গাড়ি এসে উল্টোদিকে দাঁড়াল—তাতে তিনজন লোক। একজন তেল ভরতে চেষ্টা করছে কিন্তু পারছে না, একজন বিয়ার কিনছে, আর একজন কেবল আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। ওদের হেডলাইট আমাদের গাড়ির ওপর হাই বিম করে ফেলে রেখেছে । আমরা তেল ভরার মেশিনের ধীরগতির সঙ্গে দম বন্ধ করে অপেক্ষা করছি—একটু আশঙ্কা, একটু কল্পনার দোলা। তেল ভরতেই যেন শতাব্দী লাগল। শেষ পর্যন্ত সব ঠিকঠাকভাবে বেরিয়ে এলাম, কিন্তু সেই অভিজ্ঞতাটা এখনও গায়ের লোম খাড়া করে!
অবশেষে রেনো পৌঁছানো
রাত প্রায় ১২টা। দূরে দেখা গেল ঝলমলে আলোয় মোড়া রেনো শহর—যাকে মিনি ভেগাসও বলে অনেকে। পৌঁছালাম আমাদের হোটেল “Staybridge Suites”-এ। বাইরের তাপমাত্রা তখন ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। রাতের খাওয়াদাওয়া সেরে দেড়টার দিকে ঘুমোতে গেলাম—পরদিন শুরু হবে আমাদের স্বপ্নযাত্রার আরেক রোমাঞ্চকর অধ্যায়।
![]() |
| আমাদের প্রথম রাতের আস্তানা |
পর্ব – ২ :
US Route 50 : আমেরিকার নিঃসঙ্গতম পথ ধরে
📅 ১৮ই নভেম্বর, ২০২৩ | শনিবার
📍 Reno, Nevada → Bryce Canyon City, Utah
🛣️ Distance: ৯১৩ কিমি | সময়: আনুমানিক ১১ ঘণ্টা
সকাল ৮টা নাগাদ ঘুম ভাঙল। জানালার কাচের ওপারে দেখি মেঘলা আকাশ, সাত ডিগ্রির ঠান্ডা আর পাহাড়ের চূড়ায় সাদা বরফের আস্তরণ। আমাদের আজকের গন্তব্য ইউটার ব্রাইস ক্যানিয়ন সিটি। রেনো থেকে প্রায় ৯১৩ কিমি দূরে, গুগল বলছে সাড়ে নয় ঘণ্টার রাস্তা—কিন্তু বিরতি ধরলে তা ১১ ঘণ্টা তো হবেই। তাই ব্রেকফাস্ট সেরে সকাল দশটার দিকেই যাত্রা শুরু।
![]() |
| রেনো থেকে যাত্রা শুরু |
আবহাওয়ার সাথে তাল মিলিয়ে শুরু হল বৃষ্টি, ওদিকে আমাদের সামনে অপেক্ষা করছে আজকের দুঃসাহসিক পথ: US Route 50, যার পরিচিতি “The Loneliest Road in America”! আমরা যে রুটে যাচ্ছি, সেটা সাধারণ রুটের চেয়ে আলাদা। অনেকেই লাস ভেগাস হয়ে গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন যায়, কিন্তু আমাদের রুটটা আলাদা কারণ সুরজিত ও মাম্পিকে সোমবার থেকে অফিস করতে হবে। Thanksgiving long weekend ধরেই এই রোড ট্রিপের প্ল্যান।
![]() |
| US 50 |
![]() |
| US 50 |
US 50 – এক প্রান্তে অতলান্তিক মহাসাগরের পাড়ে মেরিল্যান্ড, আর অন্য প্রান্তে ক্যালিফোর্নিয়ার রাজধানী স্যাক্রামেন্টো। মাঝে শুধু বিশাল, শুষ্ক প্রান্তর। কোথাও জনমানব নেই, কোথাও দোকানপাটও না, আর না আছে কোনও পর্যটন আকর্ষণ। মাম্পির কাছ থেকে শুনলাম—যাত্রার শেষে একটা বিশেষ কার্ডে স্ট্যাম্প পেলে লেখা থাকবে: “I have survived US 50”! তখনো জানতাম না, এই ‘বেঁচে ফেরার’ অভিজ্ঞতা কতটা বাস্তব হবে।
![]() |
| US 50 |
কারসন সিটি পেরিয়ে ফার্নলি থেকে US 50 ধরলাম। শুরুতে রাস্তার পাশে নদী, তারপর শুধু ধূসর প্রান্তর আর পাহাড়। রাস্তা যেন রুলার দিয়ে সোজা টানা, যতদূর চোখ যায় কেবল নিঃসঙ্গতা। মনে হচ্ছিল যেন পৃথিবীতে আমরা পাঁচজন ছাড়া আর কেউ নেই।
![]() |
| জনশূণ্য US 50 |
⛰️ ঘণ্টা তিনেক পর, দুপুর একটা:
প্রথম জনবসতি—Austin, ছোট্ট একটা শহর। রাস্তায় কোনও লোকজন নেই, ক্যাফেগুলো বন্ধ, শুধু একটা গ্যাস স্টেশনে সংলগ্ন দোকান খোলা, সেখানে দাঁড়িয়ে হালকা রিফ্রেশমেন্ট সেরে নেওয়া হলো। গরম গরম গ্রিন টি পান করে যেন প্রাণে একটা আরাম পাওয়া গেল।
![]() |
| প্রায় নির্জন অস্টিন শহর |
🚘 এরপরের গাড়ি চালানোর দায়িত্বে মাম্পি। যদিও সাধারণত long drive এ ওর অনীহা থাকে, তবে পরিস্থিতির চাপে ও এবার রাজি। US 50 তে গাড়ি চালানো মানেই মানসিক ধকল, কারণ ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলতে হবে একঘেয়ে, ফাঁকা রাস্তায়।
![]() |
| অস্টিন শহর |
⏱️ দুপুর সাড়ে তিনটা:
পরবর্তী স্টপ — Ely। সেখানে একটা হোটেলের রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাবার খেলাম। এখানেও ছোট্ট শহর, ঝলমলে ক্যাসিনো। ক্যাসিনোর ভেতরে একদল বয়স্ক মানুষ মেশিনের সামনে জুয়ায় মগ্ন। খাবার সেরে আবার রওনা দিলাম।
![]() |
| এলি শহরে পৌঁছে গেলাম |
![]() |
| এলি শহর |
🕕 বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা, ও সময় এক ঘণ্টা এগিয়ে গেল— কারণ আমরা পৌঁছে গেছি Utah রাজ্যে। চারপাশে অন্ধকার ঘনিয়ে এল। দিনের আলো ফুরাতেই যাত্রাপথ পেল ভৌতিক রূপ। মোবাইলে নেই সিগনাল, আশেপাশে জনমানবশূন্যতা। ভয় আস্তে আস্তে ঢুকে পড়ল গাড়ির ভেতরেও। একেক সময় মনে হচ্ছিল, যদি গাড়ি খারাপ হয় তাহলে কীভাবে খবর পাঠাব?
![]() |
| চলার পথে |
🚨 একটা মুহূর্ত ছিল সত্যি ভয়াবহ—রাস্তার মাঝখানে হঠাৎ দেখা এক বিশাল হরিণ, ঘোড়ার মতো বড়, মাথায় বিশাল সিং। সুরজিত দক্ষভাবে ব্রেক কষে গতি কমাল, হর্ণ বাজাতে হরিণটা লাফিয়ে পালাল—আর আমরা সবাই যেন প্রাণ ফিরে পেলাম।
🌃 অবশেষে... রাত ৮:৪৫
মিলফোর্ড শহরের ঝলমলে আলো দেখতে পেয়ে মনে হল, হ্যাঁ, আবার যেন সভ্যতায় ফিরলাম! আর কিছুটা গিয়েই পেলাম I-15, তারপর একটা রাস্তা ব্রাইসের দিকে। রাত পৌনে ন’টায় পৌঁছালাম Best Western Plus Hotel, তাপমাত্রা তখন শূন্য ডিগ্রির নিচে।
![]() |
| ব্রাইসে রাতের তাপমাত্রা |
দিনটা কেটে গেল ভয়, উত্তেজনা আর রোমাঞ্চে। রাতের খাওয়া সেরে শুয়ে পড়লাম—মন বলছে, আগামীকাল আরও নতুন কিছু অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য।
📌 টীকা: যারা ভবিষ্যতে US 50 ধরে রোড ট্রিপ করার পরিকল্পনা করছেন, তাদের একটা পরামর্শ—পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না থাকলে এই রাস্তায় না যাওয়াই ভাল। এই রাস্তায় “Survival Skill” থাকা অত্যন্ত জরুরি।
পর্ব – ৩:
বরফে মোড়ানো ব্রাইস ক্যানিয়নের সকাল
📅 ১৯শে নভেম্বর, ২০২৩ | রবিবার
📍 Bryce Canyon City, Utah
🌡️ তাপমাত্রা: -১° সেলসিয়াস
![]() |
| সকালের তাপমাত্রা |
সকাল সাতটায় ঘুম ভাঙতেই চোখে পড়ল ঘরের বাইরে এখনও ভাল করে আলো ফুটেনি। মোবাইল বলছে তাপমাত্রা মাইনাস এক! জানালার পর্দা সরাতে শরীরে এক শীতল শিহরণ—জীবনের প্রথম তুষারপাত দর্শন! জানলার বাইরে দেখা গেল বরফে মোড়ানো এক জাদুর রাজ্য। সাদা ঝিরঝিরে বরফ পড়ছে নিরবধি। গাছ, রাস্তা, গাড়ি—সব যেন সাদা চাদরে ঢাকা।
তবে আনন্দের সাথে সাথেই একটা চিন্তাও উঁকি দিল—এই আবহাওয়ায় বাইরে ঘোরা সম্ভব হবে তো? নাহলে তো Bryce Canyon National Park-এ আসার জন্য এতটা পথ পারি দেওয়াই বৃথা যাবে! তবে সুরজিতের পরামর্শে আমরা ভয় পেয়ে ঘরে বসে না থেকে তুষারপাতের মধ্যেই তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়লাম।
❄️ হাড় হিম করা ঠান্ডা কাকে বলে, সেটা আমরা সেদিন হাড়ে হাড়ে বুঝেছিলাম। গাড়ির দিকে যেতে যেতেই ঠকঠক করে কাঁপা শুরু! আমাদের কালো রঙের SUV তখন পুরোপুরি সাদা। কোনোমতে গাড়িতে উঠে একটু শান্তি পেলাম।
![]() |
| কালো গাড়ি বরফে সাদা |
🛎️ Bryce Canyon National Park-এর ভিতরে থাকার ব্যবস্থাও আছে, কিন্তু নভেম্বরের শেষভাগে শীতকালীন মরশুমে সেগুলো বন্ধ। তাই আমরা ছিলাম পার্কের গেট সংলগ্ন Best Western Plus Hotel-এ। পার্কে প্রবেশের জন্য টিকিট লাগলেও আমরা আগেভাগেই America the Beautiful Annual Pass কিনে নিয়েছিলাম—যা দিয়ে আমেরিকার যেকোনো ন্যাশনাল পার্কে এক বছরের মধ্যে যতবার খুশি প্রবেশ করা যায়।
![]() |
| তুষারে ঢাকা রাস্তা |
❄️ তুষারপাতের মধ্যেই অভিযান শুরু!
প্রথম পরিকল্পনা ছিল: বরফ পড়া অবস্থায় গাড়ি থেকে না নামাই ভাল। তাই পার্কে ঢুকে সোজা ২৯ কিমি দূরে দক্ষিণ প্রান্ত অবধি ড্রাইভ করে তারপর ফেরার পথে ভিউ পয়েন্টগুলো দেখা হবে। ভাবলাম, ততক্ষণে বরফ পড়াও থেমে যাবে।
![]() |
| পার্কার প্রবেশ পথে |
কিন্তু যত এগোচ্ছিলাম, বরফ পড়ার তীব্রতা তত বাড়ছিল। রাস্তা হয়ে উঠল একদম সাদা। এমন অবস্থায় সাধারণত বেশি গাড়ি চললে বরফ গলে রাস্তা পরিষ্কার হয়। কিন্তু তখন রাস্তায় গাড়ি প্রায় নেই বললেই চলে। SUV হলেও বরফের কারণে সুরজিত আর ঝুঁকি নিতে চাইল না। তাই গাড়ি ঘুরিয়ে প্রথমেই চলে গেলাম Sunset Point-এ।
![]() |
সেখানে গিয়ে দেখলাম—সত্যিই বরফ পড়া থেমে গেছে! স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে আমরা গাড়ি থেকে নামলাম।
🌄 Bryce Canyon: প্রকৃতির নিখুঁত ভাস্কর্য
Bryce Canyon National Park বিখ্যাত তার বিশালাকৃতি প্রাকৃতিক অ্যাম্ফিথিয়েটার আর Hoodoos (বিশেষ ধরনের খাড়া, সুউচ্চ পাথরের গঠন) এর জন্য। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে বাতাস, বৃষ্টি ও বরফগলা জল এই পাথরগুলোর উপর ক্ষয় সৃষ্টি করতে করতে তৈরি করেছে এই অপূর্ব ভাস্কর্য।
![]() |
| অ্যাম্ফিথিয়েটার ও হুদু |
পাথরগুলো লাল, সাদা আর কমলা রঙের মিশ্রণে এমন এক দৃশ্যপট তৈরি করেছে, যা ভাষায় প্রকাশ করা সত্যিই কঠিন। মনে হয় যেন কেউ প্রকৃতিকে রং-তুলি দিয়ে আঁকিয়েছে এক বিশাল ক্যানভাস! সাথের ছবিগুলো হয়তো কিছুটা তার ধারণা দিতে পারবে।
⛰️ উঁচুতে ওঠা আর সাহস না দেখানোর গল্প
পার্কের সর্বোচ্চ উচ্চতা ৯১০৫ ফুট—যেখানে পৌঁছতে গিয়ে তুষারপাতের কারণে আমাদের ফিরে আসতে হয়। আমরা যেসব ভিউ পয়েন্টে যেতে পেরেছিলাম, সেগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ ছিল ৮৫০০ ফুট।
সবচেয়ে জনপ্রিয় ভিউ পয়েন্টগুলোর মধ্যে রয়েছে:
-
Bryce Point
-
Sunset Point
-
Sunrise Point
-
Inspiration Point
প্রত্যেকটা পয়েন্ট থেকেই একটি করে হাইকিং ট্রেইল নিচে নেমে যায়, যেখান থেকে হুডুগুলোর সৌন্দর্য আরও কাছ থেকে দেখা যায়। কিন্তু বরফে ঢেকে থাকা পিচ্ছিল পথ দেখে আমরা আর সাহস দেখাইনি।
![]() |
| হুদু আরো কাছ থেকে |
🚗 বিদায় ব্রাইস, চল পেজের পথে
এক চিরস্মরণীয় প্রাকৃতিক অভিজ্ঞতা সঙ্গে নিয়ে দুপুর ১২টা নাগাদ হোটেল থেকে চেক-আউট করলাম। পরবর্তী গন্তব্য Arizona রাজ্যের Page শহর—২৪০ কিমি দূরত্ব।
![]() |
| বিদায় ব্রাইস |
আবার এক নতুন অধ্যায়ের শুরু, আবারও এক নতুন বিস্ময়ের খোঁজে!
📸 টিপস: Bryce-এ ঘুরতে এলে ক্যামেরা ও স্নো-গ্রিপ জুতো ভুলবেন না! আর আবহাওয়া দেখে পোশাক গুছিয়ে নেবেন—কারণ শীতে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেমন মোহিত করে, তেমনই প্রস্তুত না থাকলে বিপদেও ফেলতে পারে।
পর্ব – ৪ :
পেজ: নাভাহোদের দেশে, লাল পাথরের উপাখ্যান
বেলা তখন প্রায় সাড়ে বারোটা। ব্রাইস ক্যানিয়নের ঠান্ডা হাওয়া পেছনে ফেলে আমরা রওনা দিলাম পেজের দিকে। গত রাতের তুষারঝড়ে ঢেকে যাওয়া রাস্তার সৌন্দর্য রাতের অন্ধকারে চোখে পড়েনি, কিন্তু সকালে বেরিয়ে সে অপূর্ব দৃশ্য চোখে পড়তেই আমরা মুগ্ধ। বরফঢাকা লাল পাহাড় আর ঘন বাদামী বন ঘেরা আঁকাবাঁকা পথ ধরে এগিয়ে চললাম আমরা।
![]() |
| ব্রাইস থেকে পেজ – যাত্রাপথে অপূর্ব তুষারঢাকা প্রাকৃতিক দৃশ্য |
যাত্রাপথ অবশ্য পুরোটা মসৃণ ছিল না। কিছুটা পথ পেরোতেই আবার শুরু হল বৃষ্টি, সঙ্গে হালকা তুষারপাত। দু-একটি ছোট জনপদ পার হয়ে দুপুরের দিকে থামলাম কানাব শহরে, লাঞ্চের জন্য। শহরটা ছিমছাম, শান্ত। এখান থেকে লাল রঙের পাহাড়ের উপস্থিতি আরও জোরালোভাবে নজর কাড়তে লাগল।
ইউটা ও অ্যারিজোনার সীমানা ছুঁয়ে আমরা ঢুকে পড়লাম গ্লেন ক্যানিয়ন রিক্রিয়েশন এরিয়ায়। পথে থামা হল না, কারণ আমরা সোজা পেজ শহরের দিকে চলেছি—সেই রাতের বিশ্রামের ঠিকানা।
![]() |
| পেজ শহরের সীমানায় |
পেজ – ছোট, শান্ত, কিন্তু এক বিশাল ভৌগোলিক গুরুত্ববাহী শহর। কলোরাডো নদীর পাড় ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই শহরের আশেপাশেই আছে একের পর এক প্রাকৃতিক বিস্ময়—এ্যান্টিলোপ ক্যানিয়ন, হর্স শু বেন্ড, গ্লেন ক্যানিয়ন ড্যাম, লেক পাওয়েল… সবই যেন হাতের মুঠোয়।
![]() |
| আমাদের তিন রাতের আশ্রয় – সুন্দর এই বাড়ি |
এখানে আমাদের থাকার পরিকল্পনা তিন রাতের। কারণ পরবর্তী দুদিন আমাদের মেয়ে ও জামাই এখান থেকেই অফিস করবে। Airbnb থেকে নেওয়া হয়েছে একটা গোটা বাড়ি—তিনটে শোবার ঘর, বিশাল বসার ঘর, রান্নাঘর, দুটি বাথরুম, গ্যারাজ, আর একখানা বড় প্যাটিও। বাড়ির জানালা থেকে দূরের বরফঢাকা পাহাড় দেখা যায়—দেখলেই মন ভালো হয়ে যায়।
![]() |
| বাড়ির জানালা দিয়ে দূরে দেখা যায় তুষারশৃঙ্গ |
এখানে রান্না করেই খাওয়ার ব্যবস্থা, তাই আগেই প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে এসেছি। শহর ঘোরার ফাঁকে ফাঁকে ঘরের রান্নাতেই কিছুটা দেশি গন্ধ ও স্বাদ পাওয়া যাবে।
আপার এ্যান্টিলোপ ক্যানিয়ন: রুক্ষ সৌন্দর্যের অলিন্দে
২০ নভেম্বর, সোমবার। দুপুরে গেলাম এই অঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণ—Upper Antelope Canyon। তার আগে একটু ভূমিকা প্রয়োজন।
এই ক্যানিয়ন দুটো অংশে বিভক্ত—Upper এবং Lower। উভয় অংশই Navajo Nation বা নাভাহোদের অধীন। এখানে স্বতন্ত্রভাবে যাওয়া যায় না, যেতে হয় ট্যুর অপারেটরের মাধ্যমে, গাইডসহ। কারণ এই গুহাগুলো এখনও flash flood-এর ঝুঁকিতে পড়ে, এবং ইতিহাস বলে দিয়েছে কী ভয়াবহ রূপ নিতে পারে এই দুর্যোগ।
১৯৮৭ সালে লোয়ার ক্যানিয়নে এক ফ্ল্যাশ ফ্লাডে ১১ জন পর্যটক মারা যান। ২০১০ সালেও আপার ক্যানিয়নে ফ্ল্যাশ ফ্লাড হয়েছিল, যদিও প্রাণহানি হয়নি।
আমাদের Airbnb-এর কাছেই ট্যুর অপারেটরের অফিস। সেখান থেকে গাইডেড ট্যুরের বুকিং ছিল। সুরজিত এদিনের ট্যুরে গেল না, আর মাম্পি অফিসের মাঝখানে একটা দু-ঘণ্টার ব্রেক নিয়ে আমাদের সঙ্গে যোগ দিল। চারজনেরই ওয়েভার ফর্ম সই করা হল, তারপর ট্যুর বাসে উঠলাম।
![]() |
| নাভাহো ট্যুর অপারেটরের বাস |
বাস চালাচ্ছিলেন আমাদের গাইড, এক মধ্যবয়স্ক নাভাহো ভদ্রলোক। প্রথমে বেশ গোমড়া মুখ, ভাবলাম একদম কথা বলবে না বোধহয়। পরে বুঝলাম, তিনি চমৎকার একজন গাইড—সতর্ক, সচেতন, আর প্রয়োজনীয় তথ্যগুলো দারুণভাবে বোঝাতে পারেন।
![]() |
| আমাদের নাভাহো গাইড – একই সাথে রুক্ষ এবং আন্তরিক |
প্রায় ১৪ জন যাত্রী নিয়ে বাস চলল লাল ধুলোমাখা এক কাঁচা রাস্তায়। গেটের সামনে লেখা—"You are entering Navajo Nation at your own risk." মনে হল যেন অ্যাডভেঞ্চারের দরজায় পা রাখলাম।
![]() |
| You are entering Navajo Nation at your own risk’ – ঠিক এখান থেকেই শুরু হল অভিযান |
গুহামুখে পৌঁছে প্রবেশ করলাম আপার এ্যান্টিলোপ ক্যানিয়নে।
আলো-ছায়ার খেলা, পাথরের ভাষা
প্রথমেই যা চোখে পড়ল তা কোনো ভাষায় ব্যাখ্যা করা যায় না। স্যান্ডস্টোন পাথরের ভেতরে, জল আর সময় মিলে তৈরি করেছে এক আশ্চর্য অলিন্দ—পাথরের শরীরে আঁকা হাজারো রেখা, রঙের খেলা, এবং প্রতিটি বাঁকে অনন্য এক শৈল্পিকতা।
![]() |
| প্রাকৃতিক শিল্প – লক্ষ লক্ষ বছরের বন্যার ছাপ এঁকে দিয়েছে এই অসাধারণ রূপ |
গাইড প্রতিটি বাঁকে থামিয়ে ব্যাখ্যা করলেন, কোথায় সূর্যের আলো পড়ে কীভাবে রঙ বদলায়, কোন কোণ থেকে ছবি তুললে মিলবে বিখ্যাত “beam effect”। অনেকে মোবাইল গাইডের হাতে দিয়ে ছবি তুলতে অনুরোধ করল—তিনি হাসিমুখে তুলেও দিলেন।
![]() |
| আলো ও ছায়ার খেলা – এ যেন কোনো ম্যাজিকাল রিয়ালিজম |
আমি প্রথমে ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুলছিলাম, কিন্তু আলো যত কমতে লাগল, বুঝলাম ক্যামেরা অসহায়। মোবাইলেই ভালো ছবি আসছিল। এখানে ফ্ল্যাশ, ট্রাইপড কিছুই ব্যবহার করা যায় না। অথচ আলো-ছায়ার এমন কাব্য—একেক জায়গায় মনে হয় যেন কোনও পুরোনো মূর্তি, কোথাও চোখজোড়া, কোথাও ঢেউয়ের মত বয়ে যাওয়া রেখা।
![]() |
| আলো-ছায়ার কাব্য |
![]() |
প্রায় আধ ঘণ্টা গুহার ভেতর ঘুরে আমরা অন্য প্রান্ত দিয়ে বেরিয়ে এলাম। এরপর গুহার ওপরের পাহাড়ে উঠতে হল, সেখান থেকে বেশ কিছু সিঁড়ি নামার সময় নূপুর একটু অসুবিধায় পড়ে যায়। পরে তা হাঁটুর ব্যথায় পরিণত হয়—যা ভ্রমণের বাকি অংশের আনন্দ কিছুটা ম্লান করে দেয়।
![]() |
ঘরে ফেরা
সেদিন আর কিছু করার ছিল না। বাকি সময়টুকু সবাই যার যার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। মাম্পি অফিসের কাজে ফিরে গেল, আমি আর নূপুর কিছুটা বিশ্রাম নিলাম।
পর্ব – ৫
পেজ থেকে গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন, বাঁকে বাঁকে বিস্ময়
২১শে নভেম্বর, ২০২৩—মঙ্গলবার। দুপুরের পর, পেজ শহরে আমাদের তৃতীয় দিনে আমরা বেরোলাম গ্লেন ক্যানিয়ন রিক্রিয়েশন এরিয়া ঘুরে দেখার জন্য। আগের দিন Upper Antelope Canyon ঘোরার সময় শেষ দিকে যে সিঁড়ি দিয়ে নামতে হয়েছিল, সেটাই নূপুরের পায়ের পুরোনো ব্যথাটাকে আবার জাগিয়ে তোলে। ফলে আজ ও আর কোথাও যেতে চাইছিল না।
তবু বেড়াতে এসে কেউ যদি একা বাড়িতে বসে থাকে, তাতে বাকিদের মনেও খচখচানি থেকে যায়। তাই অনেক বুঝিয়ে-সুজিয়ে ওকেও আমাদের সঙ্গে গাড়িতে তুলে নিই। ভাবলাম, হয়তো বসে বসেই চারপাশের দৃশ্য উপভোগ করবে। কিন্তু কিছুটা পথ যেতেই ওর পা-ব্যথা বাড়তে থাকে। আর আমরা বুঝে যাই, আজকের দিনটা পুরোটা বাইরে কাটানো সম্ভব হবে না।
তার মধ্যেই আমরা ঘুরে দেখে নিই Lone Rock, Lake Powell আর Glen Canyon Dam। যতদূর সম্ভব গাড়ি থেকেই, কখনও বা একটু নেমে। প্রকৃতি এখানে যেন রুক্ষ সৌন্দর্যের মহাভান্ডার। তপ্ত লাল মাটি, তার ফাঁকে নীল জল আর বিশাল পাথরের স্তূপ—সব মিলে এক বিস্ময়কর দৃশ্যপট।
![]() |
| Lone Rock, Lake Powell |
অবশেষে ফিরে আসি আমাদের Airbnb ঘরে। নূপুরের জন্য বিশ্রাম ছিল জরুরি, আর পরদিন আমাদের সামনে অপেক্ষা করছিল এক বড় যাত্রা—গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের পথে।
![]() |
| Glen Canyon Dam |
বিদায় পেজ, অভিমুখ গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন
২২শে নভেম্বর, ২০২৩—বুধবার।
রাতভর বিশ্রাম, ঠান্ডা সেঁক আর ব্যথানাশক মালিশে নূপুরের পায়ের অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়। যদিও ও পুরোপুরি সেরে ওঠেনি, সিদ্ধান্ত নিই ওকে এই দিনটায় বিশ্রামেই রাখা হবে।
![]() |
| Glen Canyon Bridge over the Colorado River |
সকালবেলা ব্রেকফাস্ট সেরে আমি, মাম্পি আর সরগম বেরিয়ে পড়ি গ্লেন ক্যানিয়ন ড্যামের Visitor Center দেখতে। ওখানে গিয়েই চমৎকার এক অভিজ্ঞতা হল—সরগম ওখানে গিয়ে Junior Ranger হিসেবে শপথ নিল, আর সঙ্গেই পেল একটা ব্যাজ। সেটা পেয়ে ওর খুশির অন্ত নেই!
![]() |
| গ্লেন ক্যানিয়ন ভিজিটর সেন্টারে Junior Ranger হিসাবে সরগমের শপথ গ্রহণ |
কিছু সময় কাটিয়ে আমরা ফিরে আসি Airbnb-তে, কারণ এবার সময় এসেছে চেক-আউট করার। Airbnb ঘর যেমন নেওয়ার সময় কেউ থাকে না, ফেরত দেওয়ার সময়ও না। সবকিছু ইমেইলে পাঠানো কোড দিয়েই সম্পন্ন হয়। কিন্তু নিয়ম কড়াকড়ি—ঘর ছেড়ে যাওয়ার আগে রান্নাঘরের বাসনপত্র ধুয়ে ডিশওয়াশারে, আর তোয়ালে-চাদর-ওয়ার সব ওয়াশিং মেশিনে ঢুকিয়ে দিয়ে যেতে হয়।
![]() |
| ডাইনোসরের পদচিহ্ন |
এইসব কাজ গুছিয়ে, ব্যাগপত্র গাড়িতে তুলে বেরোতে বেরোতে বেলা সাড়ে বারোটা। আগে Safeway-এ গিয়ে কিছু জরুরি বাজার সেরে নেওয়া হোলো — গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের হোটেলে আমরা Room with Kitchen বুক করেছি, যাতে রান্না করে খাওয়া যায়।
হর্স শু বেন্ড: প্রকৃতির নিপুণ খোদাই
গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের পথে বেরোনোর আগে, পেজ শহরের এক অবিস্মরণীয় আকর্ষণ Horseshoe Bend দেখতে থামা হোলো । শহর থেকে সামান্য দূরে, গাড়ি পার্ক করে হাঁটতে হয় এক কিমি মতন। পথটা মসৃণ কাঁচা রাস্তা, কোনো চড়াই-উতরাই নেই, তবে রোদ ঝলমলে দুপুরে হেঁটে যাওয়াটা একটু কষ্টকরও।
নূপুর এ যাত্রায় গাড়িতেই রয়ে গেল। বাকি চারজন হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যাই সেই জায়গায়, যেখানে কলোরাডো নদী বছরের পর বছর ধরে এক পাহাড়কে এমনভাবে ক্ষয় করেছে যে তার আকার এখন অশ্বের খুরের মতো—নামেই যার প্রতিফলন।
![]() |
| কলোরাডো নদীর হাজার বছরের শিল্প—প্রকৃতির নিজের হাতে গড়া Horseshoe Bend |
প্রচুর পর্যটক, সবাই নিজেদের মতো করে ছবি তুলতে ব্যস্ত। আমরা মিনিট পনেরো কাটিয়ে ফিরে আসি গাড়ির কাছে।
স্বপ্নের ঠিকানায় পৌঁছানো
হর্স শু বেন্ড থেকে শুরু হয় আমাদের দীর্ঘ যাত্রা—পেজ থেকে গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন। দূরত্ব প্রায় ২০০ কিমি। পথে এক জায়গায় হালকা স্ন্যাক্স বিরতি নিয়ে, বিস্ময়কর ল্যান্ডস্কেপ উপভোগ করতে করতে আমরা এগিয়ে যাই।
যাত্রার শেষ অংশ পুরোটাই পাহাড়ি চড়াই। গা ছমছমে, তবে অসাধারণ দৃশ্যপট। চারপাশে প্রকৃতির এমন রূপ, যেন কোনো চলচ্চিত্রের সেটে এসে পড়েছি।
অবশেষে, বহুদিনের এক স্বপ্নপূরণ ঘটে—আমরা পৌঁছে যাই Grand Canyon National Park-এর প্রবেশপথে।
ঘড়ির কাঁটায় তখন বেলা সাড়ে চারটা।
পর্ব – ৬ :
(২১শে নভেম্বর, ২০২৩ – সূর্যাস্তের স্বপ্ন)
ব্রাইস ক্যানিয়ন ন্যাশনাল পার্কে থাকতেই আমরা “আমেরিকা দ্য বিউটিফুল” ন্যাশনাল পার্ক পাস কিনে নিয়েছিলাম। ফলে গ্র্যান্ড ক্যানিয়নে ঢোকার জন্য আলাদা করে আর টিকিট কাটার ঝামেলা হয়নি। যেহেতু আমরা Page শহর থেকে আসছিলাম, তাই গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের পূর্বদিকের প্রবেশদ্বারে বেশি ভিড় ছিল না। অথচ এই পার্কে বেশিরভাগ দর্শনার্থী ঢোকেন লাস ভেগাস দিক থেকে, সেখানে গাড়ির লাইন কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ হয় — সেটার প্রকৃত রূপ আমরা ফিরতি যাত্রায় প্রত্যক্ষ করেছিলাম।
পূর্ব গেট দিয়ে প্রবেশের পর আমাদের থাকার জায়গা Maswik Lodge বেশ দূরে। তবে এই দিক থেকে গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের অন্যতম আকর্ষণ — সানসেট পয়েন্ট — ঠিক হাতের কাছেই। অতএব, সিদ্ধান্ত নিলাম, আগে সানসেট পয়েন্ট ঘুরে তারপর হোটেলে যাব।
গাড়ি পার্ক করে পাঁচশো মিটার হেঁটে যেতে হয় পয়েন্ট অবধি। নূপুরের হাঁটার ক্ষমতা নিয়ে একটু দুশ্চিন্তা ছিল, কিন্তু ও রাজি হল আস্তে আস্তে হাঁটতে। ঠান্ডা এতটাই ছিল যে গাড়ি থেকে নামতেই আমরা বেশ কেঁপে উঠলাম। জায়গাটার উচ্চতা প্রায় সাড়ে আট হাজার ফুট — রাস্তায় বরফ পড়ে থাকতে দেখে ঠান্ডার প্রভাবটা ভালভাবেই টের পাওয়া গেল।
🌄
সানসেট পয়েন্টে দাঁড়িয়ে যে দৃশ্য আমরা দেখলাম তা জীবনে ভোলা যাবে না।
অস্তগামী সূর্যের কোমল আলো যখন ক্যানিয়নের পাথুরে বুক ছুঁয়ে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছিল, সেই মুহূর্ত যেন একটা জীবন্ত পেইন্টিং। হাজার মাইল দূর থেকে এই জায়গায় আসার পর মনে হল—এই এক ঝলকেই সব পরিশ্রম সার্থক।
![]() |
| অস্তগামী সূর্যের আলোকে আলোকিত গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন |
| সানসেট পয়েন্টে সূর্যাস্তের সেই মুহূর্ত |
সূর্য ডোবার পরপরই অন্ধকার নামল দ্রুত, আর সাথে ঠান্ডাও ক্রমে চড়ল। জঙ্গলঘেরা পথে গাড়ি চালিয়ে আমরা এগিয়ে চললাম আমাদের লজের দিকে। গাড়ির হেডলাইটে মাঝে মাঝেই চোখে পড়ছিল কয়েকটা elk – সেই বিশাল হরিণ জাতীয় প্রাণী। কিন্তু আলো কম থাকায় ছবি তোলা গেল না।
| সানসেট পয়েন্টের আরেকটি মুহূর্ত |
🏡
Maswik Lodge-এ আমাদের বুক করা দু'টি ঘরের একটি ছিল রান্নাঘরসহ। ইচ্ছা করেই এমন জায়গা নিয়েছিলাম যাতে রাতে নিজেরা রান্না করে খাওয়া যায়। সেই ঠান্ডায় বাইরে গিয়ে ডাইনিং হলে বসে খাওয়াটা কল্পনারও বাইরে ছিল।
পরিশেষে, সূর্যাস্তের রঙে রাঙা ক্যানিয়নের ছবি হৃদয়ে নিয়ে আমরা পৌঁছলাম আমাদের নতুন আশ্রয়ে – পরের দিনের অপেক্ষায়।
পর্ব – ৭ :
গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন ন্যাশনাল পার্ক — পৃথিবীর এক বিস্ময়কর প্রাকৃতিক সৃষ্টি। উত্তর আরিজোনায় অবস্থিত এই ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের পরিধি প্রায় ৪৪৬ কিলোমিটার। এটি প্রধানত তিনটি ভাগে বিভক্ত — সাউথ রিম, নর্থ রিম, এবং ওয়েস্ট রিম।
সাউথ রিম সবচেয়ে সহজগম্য, তাই অধিকাংশ (~৫০ লক্ষ) পর্যটক এখানেই ভিড় করেন। নর্থ রিম তুলনামূলকভাবে দুর্গম, মূলত অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীরা সেখানে যান। আর ওয়েস্ট রিম লাস ভেগাসের কাছাকাছি হওয়ায় day trip-এ যাওয়া যায়; এখানকার মূল আকর্ষণ — স্কাইওয়াক, যা কাঁচ দিয়ে তৈরি U-আকৃতির একটি ঝুলন্ত পথ, ক্যানিয়নের উপর দিয়ে এগিয়ে গেছে।
সাউথ রিম অভিজ্ঞতা
সাউথ রিমে থাকার জন্য অনেক অপশন রয়েছে — হোটেল, লজ, ক্যাম্পগ্রাউন্ড সবই আছে। ঘোরার জন্য রয়েছে বিভিন্ন হাইকিং ট্রেল আর ফ্রি হপ-অন হপ-অফ বাস সার্ভিস। বাসের রুট তিনটি: রেড, ব্লু, এবং গ্রীন। যে কেউ নিজ পছন্দমতো একাধিক ভিউ পয়েন্টে যেতে পারে।
শারীরিকভাবে সক্ষম হলে পারমিট নিয়ে প্রায় ৩,০০০ ফুট নিচে নেমে ট্রেক করাও যায়। অনেকে নিচে তাঁবু খাটিয়ে এক-দুই রাত কাটান, কেউ আবার নদীর ধারে হাঁটতে হাঁটতে নর্থ রিম পর্যন্ত চলে যান। কিন্তু মনে রাখতে হবে — ক্যানিয়নের নিচে তাপমাত্রা অনেক বেশি থাকে, ফলে হাইড্রেশনের ওপর খুব জোর দিতে হয়। প্রতি বছর কিছু দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়, বেশিরভাগই ঘটে অতিরিক্ত ঝুঁকি নেওয়ার কারণে।
এখানে বহু প্রজাতির পাখি ও প্রাণী দেখা যায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য — California Condor, যেটি প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু এখন সংরক্ষণের ফলে আবার বেড়েছে। এছাড়াও আছে Mountain Lion, ডিয়ার, এল্ক ইত্যাদি।
২৩শে নভেম্বর, ২০২৪ – বৃহস্পতিবার
সকালবেলা ঘরে নিজেরা ব্রেকফাস্ট বানিয়ে খেয়ে যখন বেরোতে পারলাম, তখন প্রায় সকাল ৯টা। নূপুরের পায়ের ব্যথা কিছুটা কমলেও সম্পূর্ণ সেরে না ওঠায় ও হোটেলেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। মনটা খারাপ হলেও বাকিরা বেরিয়ে পড়লাম।
প্রথমে ব্লু রুটের বাসে যাত্রা। মাঝেমধ্যে নেমে ভিউপয়েন্ট থেকে ক্যানিয়নের সৌন্দর্য উপভোগ করলাম। আমার মনে হচ্ছিল যেন সমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে আছি — এক অদ্ভুত বিস্ময় আর বশিভূত হওয়ার অনুভূতি, নিজেকে যেন ক্ষুদ্র মনে হয়।
![]() |
| গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের বিশালত্ব |
হোটেলে ফিরে লাঞ্চ সেরে আবার বেরিয়ে পড়লাম রেড রুটের বাসে — যেটা Hermit's Rest Route নামে পরিচিত এবং সবচেয়ে জনপ্রিয়। এই রুটে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে যাওয়া যায় না, ফলে বাস লাইনে বেশ ভিড় ছিল। প্রতি ১৫ মিনিটে একটি বাস ছেড়ে যাচ্ছিল। একেকটা ভিউপয়েন্টে নেমে আবার পরের বাসে উঠতে উঠতে আমরা শেষ পয়েন্টে পৌঁছে গেলাম — হারমিটস রেস্ট।
ওখানে গরম কফির কাপ হাতে একটু বিশ্রাম। কিন্তু প্রতিটি মুহূর্তে নূপুরকে মিস করছিলাম — এত সুন্দর একটা অভিজ্ঞতা ও মিস করে গেল!
ফিরে আসার পথে শেষ স্টপেজ থেকে কিছুটা হাঁটাহাঁটি করলাম। সন্ধ্যার আলোয় ক্যানিয়নের গায়ে যে রঙের খেলা — সেটা সত্যিই অবর্ণনীয়।
![]() |
| অস্তগামী সূর্যের আলোকে আলোকিত |
২৪শে নভেম্বর, ২০২৪ – শুক্রবার
সকাল ৬:৩০ নাগাদ সুরজিৎ, আমি আর নূপুর রওনা দিলাম Bright Angel Trail-এর দিকে। তখন সবেমাত্র আলো ফুটেছে আর প্রবল ঠান্ডা ও বাতাস বইছে। গ্লাভস খুলে ছবি তুলতে গিয়ে দেখি আঙুল ফেটে রক্ত পড়ছে ঠান্ডায়!
ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে ক্যানিয়নের রূপ দেখে নূপুরও অভিভূত — এই মুহূর্তটা ওর পক্ষে অত্যন্ত আনন্দের যেটা ওর শারীরিক কষ্টকে ভুলতে সাহায্য করেছিল ।
| প্রভাতী সূর্যের আলোতে আলোকিত |
ভাবছিলাম রেড রুটের বাস যদি চলত, তাহলে আরও কিছু জায়গা — বিশেষত Mojave Point দেখে নেওয়া যেত। কিন্তু দেখা গেল বাস চালু হবে সাড়ে ৮টা থেকে, আর ততক্ষণে আবার তুষারপাত শুরু হয়ে গেছে। অগত্যা গরম কফি পান করে আমরা গাড়ি নিয়ে হোটেলে ফিরে এলাম।
বিদায়ের সময়
ব্রেকফাস্ট সেরে ব্যাগ গোছগাছ করে চেক-আউট করলাম। স্বপ্নের গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন-কে বিদায় জানিয়ে লাস ভেগাসের পথে রওনা দিলাম। ওখানে দু’রাত কাটিয়ে রবিবার আমরা দীর্ঘ ড্রাইভে ফিরে যাব ফ্রিমন্ট।
| বিদায় গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন |
পর্ব - ৮ :
তারিখ: ২৪শে নভেম্বর, ২০২৩, শুক্রবার
গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের সেই বিস্ময়কর সৌন্দর্যকে পেছনে ফেলে আমরা রওনা দিলাম লাস ভেগাসের দিকে। সময় তখন সকাল প্রায় এগারোটা। পার্কের গেট ছাড়িয়ে যাওয়ার সময় চোখে পড়ল অন্তত তিন কিলোমিটার লম্বা গাড়ির লাইন—যারা ছুটির দিন কাটাতে এসেছে এই প্রকৃতি-মন্দিরে।
লাস ভেগাস এখান থেকে প্রায় ৪০৭ কিলোমিটার দূরে। রাস্তা অনুযায়ী আমাদের সময় লাগার কথা সাড়ে চার ঘণ্টা। পথে খুব একটা সময় নষ্ট না করেই আমরা এগিয়ে চললাম। মূল পরিকল্পনায় ছিল পথে হুভার ড্যাম দেখা, কিন্তু নূপুরের শরীরটা খুব একটা ভালো না থাকায় সেই পরিকল্পনা বাদ দিতে হলো। বরফে ভোরবেলায় বেরোনোর ধকলেই হয়তো হালকা জ্বর এসেছিল, যা পরে আমাদের কাছে রীতিমতো দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
গাড়ি ছুটে চলল আবার আরিজোনা থেকে নেভাডা রাজ্যে। মনে পড়ে, ক্যানিয়নের পথে আমরা ক্যালিফোর্নিয়া থেকে নেভাডা, সেখান থেকে ইউটা হয়ে আরিজোনায় ঢুকেছিলাম। তখন থেকেই লক্ষ্য করছিলাম, এই রাজ্যে এমনকি ছোট ছোট শহরেও ক্যাসিনোর উপস্থিতি চোখে পড়ে। এবারও তাই ঘটলো। গাড়িতে বসে গল্প করতে করতে আলোচনায় উঠে এল নেভাডায় ক্যাসিনো সংস্কৃতির এমন রমরমার পেছনের ইতিহাস। কিছুটা আলোচনার মাধ্যমে আর কিছুটা পড়াশোনা করে যা জানলাম, সেটা এখানে তুলে ধরলাম:
🎰 নেভাডা: মরুভূমির বুকে আলো ঝলমলে ক্যাসিনোর গল্প
🔹 আইন বৈধ করেই শুরু:
১৯৩১ সালে নেভাডা যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম রাজ্য হিসেবে জুয়াকে আইনি স্বীকৃতি দেয়। সেই সময় দেশজুড়ে চলছে মহামন্দা। রাজস্ব বাড়াতে সাহসী সিদ্ধান্ত নেয় রাজ্য সরকার।
🔹 লাস ভেগাসের উত্থান:
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় শহরটি হয়ে ওঠে সৈন্যদের বিনোদনের কেন্দ্র। দ্রুত গড়ে ওঠে একের পর এক ক্যাসিনো। সাথে আসে গ্ল্যামার, হোটেল, রাত্রিজাগা শহরের জৌলুস।
🔹 মাফিয়াদের ছায়া:
শুরুতে অনেক ক্যাসিনো গড়ে ওঠে সংগঠিত অপরাধ জগতের টাকায়। পরে অবশ্য ধীরে ধীরে পেশাদার ব্যবসায়ীদের হাতে চলে আসে এই ব্যবসা।
🔹 ভৌগলিক সুবিধা:
ক্যালিফোর্নিয়ার একেবারে গা ঘেঁষে থাকায় ভেগাসে আসা যায় সহজেই। ফলে পশ্চিম আমেরিকার মানুষদের জন্য এক ‘উইকেন্ড গেটঅ্যাওয়ে’ হয়ে ওঠে শহরটি।
🔹 ট্যাক্স সুবিধা ও ব্যবসাবান্ধব নীতি:
নেভাডায় নেই কোনো ব্যক্তিগত আয়কর। ফলে বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করতে দেরি হয়নি।
![]() |
| লাস ভেগাস শহর |
আজ নেভাডা শুধু জুয়ার স্বর্গ নয়, বরং এক বিশাল বিনোদন ও পর্যটন কেন্দ্র। আর লাস ভেগাস? তাকে আজ বলা হয়—“The Entertainment Capital of the World”।
![]() |
| লাস ভেগাস শহর |
বিকেল প্রায় সাড়ে চারটায় আমরা পৌঁছালাম লাস ভেগাস শহরের দোরগোড়ায়। তবে শহরে ঢোকার মুখেই প্রবল জ্যামে পড়ে হোটেলে পৌঁছাতে আরও এক ঘণ্টা কেটে গেল। আমাদের থাকার জায়গা শহরের বিখ্যাত স্ট্রীপে—দ্য ভেনিশিয়ান রিসর্ট। বিলাসবহুল, বিশাল এই হোটেলের ৩২ তলায় আমাদের পাশাপাশি দুটি সুইট ঘর। ঘর দুটির মাঝে সংযোগকারী দরজা, যেন একটিই পরিবারের সদস্য। জানালা জুড়ে কাঁচের দেয়াল, শহরের আলোঝলমলে দৃশ্য যেন এক স্বপ্নের ভিতর ডুবে থাকা।
![]() |
| লাস ভেগাসে আমাদের আস্তানা |
কিন্তু সেই স্বপ্ন মুহূর্তেই খানিকটা ম্লান হয়ে গেল। ঘরে ঢুকেই নূপুর একেবারে শুয়ে পড়ল—সোজা লেপের নিচে। বলল প্রচণ্ড ঠাণ্ডা লাগছে। থার্মোমিটার দেখিয়ে দিল শরীরের তাপমাত্রা ১০৩ ডিগ্রি! কোনো ওষুধ খাওয়ানোও গেল না, ও যেন একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেছে। আমি আর কোথাও যাইনি। কাঁচঘেরা জানালার ধারে বসে বাইরের ভেগাসকে এক দৃষ্টিতে দেখতে দেখতে, কখনো বা ওর কপালে হাত রেখে তাপ পরীক্ষা করতে লাগলাম।
রাত নটা নাগাদ কোনোরকমে ওকে কিছু বিস্কুট খাইয়ে একটা প্যারাসিটামল খাওয়ানো গেল। মাম্পি আর সুরজিত কিছু খাবার নিয়ে এসেছিল আমার জন্য, কিন্তু মনটাই ভালো ছিল না, গলা দিয়ে নামল না কিছুই। পরে জোর করে কিছুটা খেলাম। রাত বারোটার সময় দেখি নূপুর নিজেই লেপটা সরিয়ে দিচ্ছে। শরীর গরম নেই আর। এবার নিজেই কিছু খাবার চাইল, খেলোও। একটা ওষুধ আবার খেল। বুঝলাম, বিপদ কাটল।
পরদিন সকালবেলা উঠে দেখি, যেন কিছুই হয়নি—চোখেমুখে আগের স্বাভাবিক ছন্দ।আমাদেরও দীর্ঘ নিশ্বাস পড়ল। লাস ভেগাসের আলোঝলমে রাত্রি না দেখতে পেলেও, প্রিয়জন সুস্থ হয়ে উঠেছে—এইটাই ছিল সবচেয়ে বড় স্বস্তি।
পর্ব – ৯ :
২৫শে নভেম্বর, ২০২৩ | শনিবার | লাস ভেগাস
আজকের দিনটা আমাদের ট্রিপের একটা বিশেষ দিন – নূপুরের জন্মদিন। সকালের শুরুটা ছিল খুব শান্ত, ধীরে। দীর্ঘ যাত্রা আর গত রাতের দুশ্চিন্তার পরে সকালের ব্রেকফাস্টটা যেন সত্যিই স্বস্তির মুহূর্ত হয়ে এল। সবাই ভালোভাবে খেয়ে-দেয়ে প্রস্তুত হল নিচে নামার জন্য।
আমরা এখন রয়েছি The Venetian Resort–এ, যার বিশালতা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। একতলা আর দোতলার জুড়ে বিস্তৃত ক্যাসিনো, রেস্টুরেন্ট, শপিং এলাকা, আর একের পর এক চোখ ধাঁধানো বিনোদনের আয়োজন। শুধু এই দুটি তলায় ঢুকতে পারলেই পর্যাপ্ত বিস্ময়ের ভাণ্ডার, তবে উপরের তলাগুলোতে যেতে হলে রুম অ্যাকসেস কার্ড থাকা আবশ্যক।
আমাদের ঘোরাঘুরির শুরুটা হোলো ক্যাসিনো এলাকা থেকে। সরগমের বয়স অনুযায়ী ওকে নিয়ে যাওয়া গেল না, তাই ওকে মাম্পির সঙ্গে পাঠানো হোলো অন্য কোথাও। আমি, নূপুর আর সুরজিত ক্যাসিনোতে ঢুকে পড়লাম।
সত্যি কথা বলতে, এমন বিশাল ক্যাসিনো আগে কখনও দেখিনি। রঙিন আলো, অসংখ্য মেশিনের টুং টাং শব্দ, মানুষের উল্লাস—সব মিলে যেন এক স্বপ্নের জগৎ। কেউ কেউ টেবিলে বসে তাস খেলছে, যেন হলিউড সিনেমার কোনো দৃশ্যের মধ্যে ঢুকে পড়েছি। আর আশেপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে পানীয় পরিবেশন করা সুন্দরী যুবতীরা। অন্যদিকে লক্ষ করলাম, ধূমপানও এখানে অনুমোদিত।
আমরা তিনটি খেলা বেছে নিলাম। জন্মদিন বলে প্রথম খেলার জন্য মঞ্চে নামল নূপুর। এবং অবাক করা ব্যাপার—প্রথম খেলার হাতেই জয়! এরপর যেন জাদু ছড়িয়ে গেল, একের পর এক খেলা—কোথাও লাভ, কোথাও ক্ষতি—কিন্তু মোটের উপর দিন শেষে ঘরে ফিরলুম লাভ নিয়ে। সত্যিই, জন্মদিন বলে কথা! শেষে কাউন্টারে গিয়ে ক্যাশ তুলে নেওয়া হোলো।
![]() |
| ক্যাসিনোতে জয়ের হাসি |
তারপর সবাই মিলে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম হোটেলের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশে—একটি কৃত্রিম খাল, যেখানে ছাদটা এমনভাবে সাজানো যে সারাক্ষণই মনে হয় নীল আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে আছি। আলো এমনভাবে সেট করা, যেন দিন হোক বা রাত—ঘড়ির কাঁটায় কোনও প্রভাব পড়ে না সেই "আকাশে"। সেই খালের ওপর দিয়ে চলে গন্ডোলা—ইতালির ভেনিসের আদলে তৈরি নৌকা।
![]() |
| হোটেলে কৃত্তিম আকাশ ও দোকানপাট |
আমরা একটা গন্ডোলার টিকিট কেটে ফেললাম। যেহেতু চারজনের বেশি ওঠা যাবে না, তাই আমি উঠলাম না—ছবি তোলাতেই মন দিলাম। মাম্পি আর জামাই উঠে পড়ল সরগম আর নূপুরের সঙ্গে। মাঝি ছিল একজন অল্পবয়সী, প্রাণবন্ত মেয়ে। নূপুরের জন্মদিন জেনে ও যখন ওর উদ্দেশ্যে গান গেয়ে উঠল, দৃশ্যটা হয়ে উঠল অপূর্ব—আর আমি সেই মুহূর্তটা বন্দি করলাম ভিডিওতে।
![]() |
| গন্ডোলায় ভ্রমণ |
আরেকটি গন্ডোলায় চোখে পড়ল এক জোড়া যুবক-যুবতী ও এক বৃদ্ধ পাদ্রী—প্রেমিক যুগলটি জলপথেই বিয়ে করছিল। পারে দাঁড়িয়ে আত্মীয়রা উল্লাসে মাতোয়ারা। পুরো দৃশ্যটাই যেন সিনেমার মতো মনে হচ্ছিল।
![]() |
| গন্ডোলায় বিবাহ |
এই অসাধারণ দিনের প্রথমার্ধের শেষে আমরা ঘরে ফিরে এলাম একটু বিশ্রামের জন্য, কারণ সন্ধ্যায় অপেক্ষা করছে আরও এক স্মরণীয় অভিজ্ঞতা।
পর্ব – ১০ :
২৫শে নভেম্বর, ২০২৩ | শনিবার | অপরাহ্ন
সন্ধ্যার দিকে আমাদের লাস ভেগাসের সফরে আরও কিছু প্রিয় মুখ যোগ দিল। শুভাঙ্কু, সঞ্চারি, তাঁদের কন্যা রাই এবং সঞ্চারির বাবা-মা—সমীরবাবু ও শুভ্রাদেবী এসে পৌঁছলেন। শুভাঙ্কু সুরজিতের কলেজবেলার বন্ধু। সরগমও তার বন্ধু রাইকে পেয়ে দারুণ খুশি।
এই সন্ধ্যার জন্য আমাদের বিশেষ পরিকল্পনা ছিল। আমাদের হোটেল ভেনেশিয়ান রিসোর্টের একদম বিপরীতে, মিরাজ হোটেলের অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে বিশ্বখ্যাত Cirque du Soleil-এর একটি অনুষ্ঠান, যেখানে The Beatles-এর কালজয়ী সংগীতকে ঘিরে তৈরি হয়েছে এক চোখধাঁধানো পরিবেশনা।
![]() |
| লাস ভেগাসের নৈশদৃশ্য |
প্রোগ্রাম শুরু হতেই মনে হলো যেন সময়টা থেমে গেছে—বিটল্সের “All You Need is Love”, “Come Together”, “Lucy in the Sky with Diamonds” কিংবা “Here Comes the Sun” এর মতো চিরকালীন গানগুলোর ভেতর দিয়ে আমরা যেন হারিয়ে গেলাম এক সুরেলা দুনিয়ায়। সার্ক দ্য সোলে-র চেনা অ্যাক্রোবেটিক কৌশল, চমৎকার আলো-ছায়ার খেলা, অত্যাধুনিক ভিজ্যুয়াল ইফেক্ট এবং দুর্দান্ত কোরিওগ্রাফি মিলে শো-টি হয়ে উঠেছিল এক অতুলনীয় অভিজ্ঞতা।
![]() |
| Cirque du Soleil |
![]() |
| Cirque du Soleil |
এই পরিবেশনা ছিল শুধুমাত্র একটি বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান নয়, বরং বিটল্সের সংগীতের প্রতি এক হৃদয়গ্রাহী শ্রদ্ধার্ঘ্য। আমাদের দলের ছোট-বড় সকলেই মুগ্ধ হয়ে উপভোগ করল এই মিউজিকাল জাদু। সৌভাগ্যবশত, এই শোটি জুলাই ২০২৪-এ বন্ধ হয়ে গেছে—তাই শেষ মুহূর্তে তা দেখতে পারার অভিজ্ঞতাটা আরও মূল্যবান হয়ে উঠল।
![]() |
| Cirque du Soleil |
![]() |
| Cirque du Soleil |
প্রায় দেড় ঘন্টার শো শেষ হওয়ার পরেও মনে হচ্ছিল আমরা যেন এখনো সেই সুরের ঘোরের মধ্যেই আছি। মনে পড়ে গেল আট বছর আগে ডিজনিল্যান্ডে দেখা “আলাদিন” শো-এর কথা—আশ্চর্য রকমের মিল।
![]() |
| Cirque du Soleil |
বাইরে বেরিয়ে দেখি সন্ধ্যার আলোয় ঝলমলে হয়ে উঠেছে লাস ভেগাস স্ট্রিপ। রাস্তার দুপাশে ভিড়ের স্রোত—লোকজন এক হোটেল থেকে আরেক হোটেলে ঘুরে বেড়াচ্ছে, কেউ ক্যাসিনোতে, কেউ বা কোনো লাইভ শো দেখতে যাচ্ছে। কলকাতার দুর্গাপুজোর সময়ের প্যান্ডেল হপিং-এর কথা মনে পড়ে গেল।
![]() |
| লাস ভেগাসের নৈশদৃশ্য |
![]() |
| লাস ভেগাসের নৈশদৃশ্য |
আমরাও তখনই সিদ্ধান্ত নিলাম—চল, একবার Caesars Palace দেখে আসা যাক।
![]() |
| সিজার প্যালেস হোটেল |
Caesars Palace শুধু একটি হোটেল নয়—এটি যেন এক জীবন্ত ইতিহাস। ১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই রিসর্টটি প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের স্থাপত্য অনুকরণে নির্মিত, যার প্রতিটি কোণেই ছড়িয়ে রয়েছে রাজকীয় শৌর্য ও জাঁকজমক।
![]() |
| সিজার প্যালেস হোটেল |
প্রবেশপথে বিশাল রোমান মূর্তি, মার্বেল কলাম আর জলপ্রপাতের মাঝে দাঁড়িয়ে মনে হয় যেন আমরা অন্য এক সময়ে পৌঁছে গেছি। হোটেলের অভ্যন্তরেও সেই রাজকীয়তা বজায়—ভিতরের মার্বেল ফ্লোর, শিল্পকর্ম ও ক্লাসিক সজ্জা এক অনন্য সৌন্দর্য উপহার দেয়।
![]() |
| সিজার প্যালেস হোটেল |
এখানে শুধু বিলাসবহুল থাকার বন্দোবস্তই নয়, আছে বিশ্বমানের ক্যাসিনো, লাইভ পারফর্মেন্সের জন্য বৃহৎ অডিটোরিয়াম, আর এক অত্যাধুনিক শপিং এরিয়া—The Forum Shops, যেখানে বিশ্বের সেরা ব্র্যান্ডগুলোর সমাবেশ।
![]() |
| সিজার প্যালেস হোটেল |
কিছু সময় সেখানে ঘুরে ফিরে আমরা আবার ফিরে এলাম ভেনেশিয়ান হোটেলে। রাতের খাবার সেরে ঘুমোতে যেতেই প্রায় রাত এগারোটা বেজে গেল।
২৬শে নভেম্বর, ২০২৩ | রবিবার
আজ আমাদের দীর্ঘ সফরের শেষ দিন। সকালে ব্রেকফাস্ট সেরে গুছিয়ে নিতে নিতে ঘড়ির কাঁটা দশটা ছুঁই ছুঁই। হোটেল থেকে চেক আউট করে আমরা রওনা হলাম শেষ গন্তব্য ফ্রিমন্টের পথে।
১৭ই নভেম্বর, শুক্রবার যে দীর্ঘ যাত্রা শুরু হয়েছিল, আজ তার শেষ অধ্যায়। লাস ভেগাস থেকে ফ্রিমন্ট—মোটামুটি ৫৫০ মাইল (প্রায় ৮৮৫ কিলোমিটার) পথ। মাঝে দু-তিনবার বিরতি নিয়ে সেই দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে রাতে সাড়ে নটা নাগাদ বাড়িতে পৌঁছলাম।
![]() |
| ঘরে ফেরার পথে সূর্যাস্ত |
![]() |
| ক্যালিফোর্নিয়ার পথে |
সমাপ্তি
১৭ই নভেম্বর, ২০২৩-এ শুরু হওয়া আমাদের এই রোড ট্রিপ শুধু একটা ভ্রমণ ছিল না, ছিল একসাথে সময় কাটানোর, নতুন কিছু দেখার আর অনুভব করার এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা।
![]() |
| অবশেষে ক্যালিফর্নিয়া |
গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের পথে—এই ভ্রমণ কাহিনীর প্রতিটি পর্বের পেছনে আছে মুহূর্তে মুহূর্তে গাঁথা শত গল্প, স্মৃতি আর অনুভব। যারা এই সফরের অংশ ছিলেন, আর যারা লেখা পড়ে আমাদের সঙ্গে ছিলেন—তাঁদের সবাইকে কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা।
যাদের জন্য এই অনন্য ভ্রমণ সম্ভন হোলো, আমাদের কন্যা ও জামাতা, অনন্যা ও সুরজিৎ, আমাদের নাতনি সরগম, যে এই দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় আমাদের অনাবিল আনন্দ প্রদান করেছে আর অবশ্যই যারা দীর্ঘ সময় ধরে লেখা ধৈর্য ধরে পরে সাথে ছিলেন তাদের সবাইকে কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা।
(সমাপ্ত)




























.jpeg)























.jpeg)

.jpeg)
.jpeg)

.jpeg)

.jpeg)
.jpeg)
.jpeg)
.jpeg)
.jpeg)
.jpeg)
.jpeg)
.jpeg)
.jpeg)
.jpeg)
.jpeg)
.jpeg)
.jpeg)


খুব রোমাঞ্চকর ভ্রমনের সাথী হলাম।
উত্তরমুছুনদারুণ
উত্তরমুছুনBeautiful style of writing
উত্তরমুছুনSir, apnar lekha jemon sundar, photography o temoni. Kichu kichu nature er alo chayar khela to unbelievable mone hoy.
উত্তরমুছুন