নয় পাগলের ভ্রমণগাথা
২০২৩ এর এপ্রিল মাস, ভয়ঙ্কর গরম চলছে I নয়টি বুড়োবুড়ির মাথায় খেয়াল চাপলো এই গরমে কোথাও একদিন ঘুরে এলে কেমন হয়। পাগলগুলো বলে কিনা এখানেতো বাড়ী বসে গরমে কষ্ট পাচ্ছি। কোথাও বেড়াতে গেলে সেখানে গিয়েই নাহয় কষ্ট পাব। সাথে বেড়ানটাতো হবে। তা এরা যদি পাগল না হয় তো পাগল কাদের বলা যায়। যেমন ভাবা তেমন কাজ। সবাই মিলে উৎসাহে ঝাঁপিয়ে পড়ল। গন্তব্য স্থির হোলো বকখালি। এক বুড়ো তার এক চেনা হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করে ফেলল ফোনাফুনি করে। আরেক বুড়ো বাতানুকুল বাহনের ব্যবস্থা করে ফেলল চটপট।
এই বুড়োগুলো যখন ছোট্টটি ছিল তখন একসাথে স্কুলে পড়ত। কাজেই সবাই মিলে একসাথে বাতানুকুল বাসে নিজেদের মধ্যে খুনসুটি করতে করতে চলল বকখালি। পথে বাস দাঁড়াল ডায়মন্ডহারবারে সরকারি হোটেল সাগরিকাতে। জমিয়ে ব্রেকফাস্ট করল সবাই মিলে। তারপর বাস আবার রওনা হোলো বকখালির দিকে। বাসে ওঠার আগে অবশ্য কয়েকটা বুড়ি ডায়মন্ডহারবারের বিখ্যাত বেতের টুপী কিনে নিল। খানিকটা বেচারা ফেরিওয়ালার প্রতি দয়াপরবশত হয়েই। ঐ গরমে পর্যটকহীন ডায়মন্ডহারবারে বেচারা ঠায় রোদের মধ্যে দাড়িয়ে আছে যদি কেউ কেনে সেই আশায়।
![]() |
| সাগরিকাতে ব্রেকফাস্ট |
যাইহোক, বাস কাকদ্বীপ, নামখানা হয়ে বকখালি পৌঁছে গেল বেলা সাড়ে বারোটায়। থাকার জায়গা স্থির ছিল হোটেল ইনোদয়। বীচের কাছাকাছি। চারতলা সুরম্য হোটেলটিতে মোট ছত্রিশটা ঘর। কিন্তু পুরো হোটেলে অতিথি বলতে ঐ নয় বুড়োবুড়ি। সব ঘরই বাতানুকুল। ব্যবস্থা মোটের ওপর ভালই। পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। ঘর লাগোয়া বারান্দা থেকে দিব্যি সমুদ্র দেখা যায়।
![]() |
| হোটেল ইনোদয় |
ওরা বকখালি পৌঁছেই প্রথমেই যেটা অনুভব করল, সেটা হোলো তাপমাত্রার হেরফের। কলকাতার তাপমাত্রার থেকে বকখালির তাপমাত্রা অন্তত দশ ডিগ্রি নীচে। কলকাতায় যখন ৪২, ওখানে তখন ৩২। কোনো তাপপ্রবাহও নেই। ফলে সকলেই খুব স্বস্তি অনুভব করল।
দুপুরে জমাটি ভোজনের পরে বেশ খানিকটা দিবানিদ্রা সেরে বিকেলে সবাই মিলে আবার হৈহৈ করে বাসে করে গেল ফ্রেসারগঞ্জের কার্গিল বীচে। ওখান থেকে নাকি সুন্দর সূর্যাস্ত দেখা যায়। কিন্তু দিগন্তে মেঘ থাকায় সেদিন আর ওরা সূর্যাস্ত দেখতে পেলনা। বেশ কিছুক্ষণ ওখানেই সমুদ্রপাড়ে বসে আড্ডা চলল। সাথে চা, বিস্কুট। ওখানে একটা দোকানে লেখা আছে তন্দুর চা পাওয়া যায়। সেটা কি বস্তু বোঝা গেলনা। কারণ পর্যটকের অভাবে তখন সেই চা বন্ধ।
কার্গিল বীচ থেকে ওরা গেল বকখালি বীচে। তুলনামূলকভাবে সে জায়গাটা একটু জমজমাট। যদিও সন্ধ্যা হয়ে গেছে কিন্তু বেশ আলোকিত। তখন জোয়ারের সময়, ফলে জল একেবারে কাছে। বেশ কিছু সময় ওখানে কাটিয়ে তারপর হোটেলে ফেরা।
![]() |
| সন্ধ্যায় জমজমাট বকখালি বিচ |
সান্ধ্য আসর বসল হোটেলের ছাদ বাগানে। অপূর্ব পরিবেশে অচিরেই জমে উঠল আসর। হুহু করে হাওয়া বইছে। গরমের লেশমাত্র নেই। পানীয়ের সাথে স্যালাড আর আমোদি মাছ ভাজা। বুড়োবুড়িগুলোর আমোদের আর শেষ নেই। একবুড়ো সাথে নিয়ে গেছিল মাউথ অরগ্যান আর গীটার। খুবই ট্যালেন্টেড বুড়ো। একাধারে দক্ষ উকিল ও দক্ষ গাইয়ে বাজিয়ে। আসর পুরো জমে ক্ষীর।
![]() |
| সেই ট্যালেন্টেড বুড়ো |
পরেরদিন ভোরে উঠেই পদব্রজে সমুদ্রপাড়ে। তখন ভাটার সময়। জল বহুদূরে চলে গেছে। বালিতট ধরে পায়ে পায়ে হাঁটা। বেশ কিছু সময় কাটিয়ে হোটেলে ফিরে স্নান, ব্রেকফাস্ট সেরে আবার ৪৩ ডিগ্রীর দিকে রওনা দেওয়া।
পরিশেষে বলি, যেরকম মনোরম আবহাওয়াতে হুজুগে ঘুরে এলো তাতে অনায়াসেই বলা যায় যে নয় বুড়োবুড়ি অতটা উন্মাদ নয়।
![]() |
| বকখালি বিচ |





মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন