কেনিয়া ভ্রমণ

পর্ব


২৬/০৫/২০২২ তারিখে স্থানীয় (নাইরবি) সময় সকাল ছটায় (ভারতীয় সময় সকাল সাড়ে আটটা) প্লেনের চাকা যখন রানওয়ে ছুঁল তখনও প্রায় ছহাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থিত দক্ষিন গোলার্ধের এই শহরে ভাল করে দিনের আলো ফোটেনি। তিনবছরের প্রচেষ্টা অবশেষে সফল হোলো। ২০১৯ থেকে পরিকল্পনা চলছে। ২০২০র সেপ্টেম্বরে আমাদের কেনিয়া তাঞ্জানিয়া সফরের সব ব্যবস্থা হয়ে গিয়েছিল। অতিমারীর কবলে সেবারের প্রোগ্রাম ভন্ডুল হোলো। নতুন করে আবার পরিকল্পনা হোলো অতিমারীর প্রকোপ কমার পর এই বছরের ফেব্রুয়ারিতে। সেটাও ওমিক্রনের জন্য আবার পিছিয়ে মে মাসে আসা ঠিক হোলো। তবে এযাত্রায় শুধুই কেনিয়া। তাঞ্জানিয়া  বাদ কারণ ওখানে করোনার পরিস্থিতি এখনও খারাপ। 


তিন স্কুলের বন্ধুমিলে আসা; আমি, প্রীতম (পার্থ গুপ্ত) আর অমতি (অমিত ঘোষ) আমাদের আরেক স্কুলের বন্ধু অশোক ঘোষ এখানে বারো বছর ধরে এক বহুজাতিক বীমা কোম্পানির সর্বময় কর্তা। ওরই উৎসাহে আর ব্যবস্থাপনায় আমাদের আসা। 


কলকাতা থেকে দুবাই হয়ে দীর্ঘ বিমান যাত্রার শেষে নাইরবির জোমো কেনিয়াট্টা এয়ারপোর্টে আমাদের অবতরণ। ছোট বিমানবন্দর, আমাদের বাগডোগরার থেকে কিছুটা বড়। দক্ষিন গোলার্ধে এখন শীতের মরশুম শুরু হয়েছে। আর উচ্চতা জনিত কারণে নাইরাবিতে সারা বছরই ঠান্ডা ঠান্ডা কুল কুল, অনেকটা কুড়ি বছর আগের ব্যাঙ্গালোরের মতন। 


এয়ারপোর্টে ছয়সকালে অশোক হাজির গাড়ী নিয়ে বন্ধুদের স্বাগত জানাতে। ব্যবস্থাও নিঁখুত। বিমানবন্দরের ভিতরে লোক নিয়োগ করে রেখেছিল যে আমাদের রিসিভ করে অভিবাসন  মালপত্র সংগ্রহ বহনে  সাহায্য করল। 


এয়ারপোর্ট থেকে সাতাশ কিমি দূরের অশোকের ভিলাতে আসতে সময় লাগল মাত্র আধ ঘন্টা। শহরের বুক চিরে চিনেদের বানান ছয় লেনের ঝাঁ চকচকে রাস্তা সবে দুসপ্তাহ হোলো চালু হয়েছে (বোধহয় আমরা আসব বলে তড়িঘড়ি খুলে দিয়েছে 😃) উদ্দাম গতিতে গাড়ী চলে এলো, খরচ তিনশ শিলিং (ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় দুশ টাকা) রাস্তায় আসতে আসতে দেখলাম প্রচুর লোক হেঁটে চলেছে। দেখে মনে হচ্ছিল বুঝি কোথাও জনসভায় যোগ দিতে যাচ্ছে সকাল সকাল। অশোকের কাছে জানলাম, হরি। ওরা নাকি অফিস যাচ্ছে। আসলে একতো গরীব দেশ, বাসভাড়া সবাই যোগাড় করতে পারেনা। তার ওপর শুনলাম বাসের ভাড়ারও কোনো ঠিক ঠিকানা নেই। বৃষ্টি পড়লেই ভাড়া বেড়ে যায় (কলকাতার ট্যাক্সির মতন আরকি) আবার অফিস টাইমেও নাকি ভাড়া বেড়ে যায়। তাই লোকে হাঁটা পছন্দ করে। সেইজন্যই হয়তো এইসব দেশ দূর পাল্লার দৌড়বিদ  উপহার দিতে পারে পৃথিবীকে। তবে একটা কথা উল্লেখ্য, পুরুষ, নারী নির্বিশেষে এদের পোষাক আর মাথার চুলের (বিনুনির) বাহার দেখার মতন।


বিমানবন্দর থেকে আসার পথে আর বাসস্থানের বাগানে বা আশেপাশের বাড়ীর বাগানগুলোতে যে পরিমান বিভিন্ন প্রজাতির পাখী দেখলাম তাতে একটা জিনিষ পরিস্কার যে এখানে থাকার দিনগুলো ভালই কাটবে। আজ ক্যামেরা, লেন্স, কার্ড সব রেডী করে কাল থেকে শিকার শুরু করব। 


দীর্ঘযাত্রার পরে আজকের দিনটা বিশ্রামের জন্য ধার্য আছে। তাই আজ সারাদিন বন্ধুপত্নি শম্পার আতিথেয়তার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করা আর ঘুমানো ছাড়া বিশেষ কাজ নেই।




গাড়ির মধ্য থেকে মোবাইলে তোলা সেই চিনে রাস্তার ছবি 



পর্ব


কথায় বলে খাচ্ছিল তাঁতি তাঁত বুনে, কাল হোলো তার এঁড়ে গরু কিনে। দিব্যি ছিলাম পাখী দেখে, ছবি তুলে আর মাঝেমাঝে কিছু ছবি ফেবুতে পোস্টিয়ে জনগণের হাততালি কুড়িয়ে। হঠাৎ কি যে হোলো দুকলম লিখতে গিয়ে এখন অবস্থা বাঘের পিঠে সওয়ার হবার মতন। 


তথ্য দিয়ে লেখাটা অনাবশ্যক ভারাক্রান্ত করার ইচ্ছা নেই, আজকাল সবই গুগলে পাওয়া যায়। তবু যেটুকু না বললেই নয়। ১৮৯৫ সাল থেকে কেনিয়া দেশটি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কলোনি। তখন অবশ্য দেশটির নাম কেনিয়া ছিলনা। ইংরেজরা বলত ব্রিটিশ কেনিয়া বা ব্রিটিশ ইস্ট আফ্রিকাI  ১৯২০ থেকে এর নাম হোলো কেনিয়া এবং দেশ স্বাধীন হয় ১৯৬৩ তে।


এইটুকু বলতেই হোলো কারণ এখানে সবকিছুর মধ্যে এখনও ব্রিটিশ প্রভাব খুবই স্পষ্ট বোঝা যায়। সে বাড়ীঘরের আর্কিটেক্চারই হোক বা জীবনযাপনের রীতিনীতিই হোক। পরিছন্নতা হোক বা শিক্ষাদীক্ষা হোক সবেতেই ইংরেজদের একটা প্রভাব দেখা যায়। এমনকি বিভিন্ন বৈদ্যুতিন যন্ত্রের প্লাগ পয়েন্ট গুলোও ব্রিটেনের মতন। ফলে আমাদের সব রকম গ্যাজেটই চার্জিং করতে হচ্ছে কলকাতা থেকে আনা অ্যাডাপ্টার দিয়ে। ভাগ্যিস্ অশোক আগে থেকে সাবধান করে দিয়েছিল।


আসিফ করিমের কথা মনে আছে? কেনিয়া ক্রিকেট দলের অধিনায়ক ছিলেন। ডান হাতে ব্যাট করতেন আর বাঁ হাতে বল করতেন। ওর অধিনায়কত্বে কেনিয়া ১৯৯৯ একদিনের বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে দিয়েছিল। করিম নিজে তিনটে উইকেট নিয়েছিলেন, রিকি পন্টিংয়ের উইকেট সহ। এরপর ২০০৩ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালেও ওঠে কেনিয়া যদিও ভারতের কাছে হেরে যায়। করিমের পিতামহ প্রায় একশ বছর আগে গুজরাট থেকে কেনিয়ার মোম্বাসাতে চলে আসেন। করিম শুধু ক্রিকেটই নয় ভাল টেনিসও খেলতেন। ফ্রেঞ্চ ওপেনেও অংশগ্রহণ করেছেন। বর্তমানে উনি একজন সফল ব্যবসায়ীও বটে। 


এহেন এক ক্রীড়াবিদের  সাথে আজ সাক্ষাৎ হোলো। উনি অশোকের খুব ভাল বন্ধু। প্রথমে ওঁর অফিসে দেখা হোলো। পরে উনি নিয়ে গেলেন ওঁর ক্লাবে মধ্যাহ্নভোজন করাতে। এ্যাতো বড় মাপের এক মানুষ অথচ এ্যাতো নিপাট ভদ্রলোক যে আলাপ না হলে এবং দুঘন্টা সময় না কাটালে জানতে পারতামনা। কত গল্প যে করলেন। 


বিশ্বকাপে রিকি পন্টিংকে আউট করা সেই বল হাতে আসিফ করিম



আসিফের সাথে আমরা চার মূর্তি, 
(বাঁদিক থেকে, প্রীতম, অশোক, আসিফ, আমি ও অমতি)


আজ সারাদিন মেঘলা। মাঝে মাঝে বৃষ্টি। ফলে অশোকের বাড়ীর বাগানে কিছু সুন্দর পাখী দেখছি অথচ ছবি তুলতে পারছিনা আলোর অভাবে। 


কাল ভোর বেলায় বেড়িয়ে পড়ছি নাইরোবি ন্যাশনাল পার্কের উদ্দ্যশ্যে।



পর্ব


জাম্বো (হ্যালো),


নাইরোবি শহরটা খুব সুন্দর। অধিকাংশ রাস্তা দেখে বোঝা মুস্কিল যে সেটা ইউরোপ বা আমেরিকার কোনো শহরের না আফ্রিকার এক তথাকথিত অনুন্নত দেশের রাস্তা। পরিস্কার পরিচ্ছন্ন, বেশীর ভাগ গাড়ী খুব নিয়ম মেনে চলে। কোনো হর্ণের শব্দ চেষ্টা করলেও শোনা যাবেনা। জ্যামেও নয়। রাস্তার পাশে পাশে বিভিন্ন দোকানি তাদের পসরা সাজিয়ে রেখেছে সুন্দর ভাবে। ট্রাফিক সিগন্যালে দেখলাম হকাররা ঘুরে বেড়াচ্ছে। কয়েকজন দেখলাম বাদামও বিক্রী করছে। আমি বললাম যে এদেরকাঁচা বাদাম….” গানটা শিখিয়ে দিলে কেমন হয়? তার উত্তরে অশোক যা বলল তাতে চক্ষু ছানাবড়া) ওরা নাকি গানটা জানে গেয়েও থাকে।ভুবনবাবু, ভাই শুনছেন তো?”


তবে সবই ভাল? কখনই নয়। আজ তিনদিন হোলো এখানে এসেছি। একদিনের জন্যও হাঁটতে যাবার অনুমতি পাচ্ছিনা অশোক বা শম্পার থেকে। যে রোজ সকালে সাড়ে চার কিমি হাঁটে  তার কাছে এটা শাস্তি বইকি। কিন্তু এই নিষেধের যথার্থ কারণ আছে। একে দরিদ্র দেশ তার ওপর বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির জন্য এবং অবশ্যই অতিমারীর জন্য সব দেশের মতন এদেরও অর্থনীতির অবস্থা খুবই সাংঘাতিক। তার ওপর রয়েছে সীমাহীন দুর্নীতি। ফলে বিশেষ করে এক অচেনা লোকের খুব সহজেই mugged হবার সম্ভাবনা খুব প্রবল। কেনিয়ার বৃহত্তম, আর আফ্রিকার দ্বিতীয়  বৃহত্তম বস্তি, কিবেরাও দেখলাম। অনেকটা আমাদের ধারাভীর মতন।


আজ বিকালে ওয়েস্টগেট নামের এক শপিং মলে  গিয়েছিলাম সদলবলে। অশোকদের বাড়ীর কাছেই। আমাদের যাবার বিশেষ প্রয়োজন ছিল দুটো কারণে। প্রথমতঃ কিছু এদেশীয় মুদ্রা সংগ্রহ করা, কারণ সোমবার থেকে আমাদের প্রয়োজন হবে। আর দ্বিতীয়তঃ এই মলটির একটি বেদনাদায়ক ইতিহাস আছে। ২১শে অক্টোবর, ২০১৩ তে আলকায়দা জঙ্গীরা এই মলটির দখল নেয়। ৬৭টি নিরীহ প্রান শতাধিক আহত হবার পর (সরকারি হিসাবে) তিনদিন পরে মলটি দখলমুক্ত হয়। 


একটা মজার কথা না বলে আজ শেষ করা যাবেনা। মলে Carrefour নামের একটি দোকানে (আমাদের Spencer এর মতন) আমরা ঢুকেছিলাম কিছু কেনাকাটা করার জন্য। যখন বিলিং কাউন্টারে আমাদের পালা এলো পেমেন্ট করার জন্য, দোকানের কয়েকজন কর্মচারী হৈ হৈ করে ছুটে এলো আমাদের দিকে। স্বাভাবিকভাবেই আমরা খুব আতংকিত হয়ে পড়লাম (বিশেষতঃ আমি, কারণ আমি পাসপোর্ট বাড়ীতে রেখে গেছিলাম, এখানে নাকি সবসময় সাথে রাখতে হয়) যাইহোক, অশোক আর শম্পা যেটা ওদের সাথে কথা বলে  উদ্ধার করল তার মানে হোলো শম্পা আজ যা যা কিনেছে তার জন্য কোনো দাম দিতে হবেনা। কারণ ওর নাম এবং বিল নং টা লাকি ড্রতে উঠেছে। আমরা তো হতবাক। তারপর আফশোষ; ঈসস্, আরও কিছু (অপ্রয়জনীয়) জিনিষ কিনলেই হোতো 😃 যাইহোক খুব ঘটা করে ছবিটবি তুলে ওরা শম্পাকে সংবর্ধিত করল। তারপর ছাড়া পেলাম। 😃


আসান্তে সান (ধন্যবাদ)


(সোয়াহিলি ভাষাজ্ঞানের দৌড় আপাততঃ এইটুকুই 😃)



















শপিং মলে শম্পাকে সংবর্ধনা 



পর্ব


শুক্রবার সারারাত অঝোরে বৃষ্টির জন্য খুব চিন্তায় পড়ে গেছিলাম কারণ পরের দিন ভোরে আমরা যাব নাইরোবি ন্যাশনাল পার্কে। ভোর সাড়ে পাঁচটায় গাড়ী আসবে। সেজন্য সাড়ে চারটায় অ্যালার্ম দেওয়া ছিল। 


বাড়ী থেকে পৌঁছাতে সময় লাগল আধঘন্টারও কম। পার্কের মূল ফটকে পাসপোর্ট ইত্যাদি দেখিয়ে টিকিট কেটে (বিদেশীদের জন্য বেশ চড়া মূল্য, USD50.00, অশোক যেহেতু এদেশের স্থায়ী বাসিন্দা, নাগরিক নয়, ওর টিকিটের দাম অবশ্য অনেকটাই কম) যখন ভিতরে প্রবেশ করলাম তখনও ভাল করে দিনের আলো ফোটেনি। আকাশ মেঘে ভর্তি, টিপটিপ করে বৃষ্টি অল্প হলেও পড়ছে আর ভাল ঠান্ডা। বাড়ি থেকে বেরনোর আগে অমতি আর প্রীতম সোয়েটার বা জ্যাকেট পরতে চাইছিলনা। আমরা রীতিমতন ধমক দিয়ে পরতে বাধ্য করেছিলাম। ওরাও দেখলাম এখন জ্যাকেটের চেন টাইট মারছেI😃



পার্কের মূল ফটক


নাইরোবি শহরের উপকন্ঠে অবস্থান এই পার্কের। অনেকটা ব্যাঙ্গালোরের বানারঘাটা ন্যাশনাল পার্কের মতন আরকি। প্রায় চার বছর ব্যাঙ্গালোরে থাকা সত্বেও ওখানে কোনো দিন যাইনি। যারা গিয়েছিলন তাদের কাছে ওটার বর্ণনা শুনে আমি যাবার উৎসাহ পাইনি। তাই অশোক যখন এই ভ্রমণের পরিকল্পনা করার সময় এটাকেও রাখে প্রোগ্রামের মধ্যে তখন সত্যি বলতে কি একটু সন্ধিগ্ধ ছিলাম এর সম্পর্কে। অশোক শম্পা দুজনেরই আমাদের সাথে আসার কথা থাকলেও জরুরী কাজ থাকায় শম্পা আসতে পারলনা। 


এই পার্কের আয়তন ১১৭ বর্গ কিলোমিটার (বানারঘাটা পার্কের আয়তন কিন্তু ২৬৯ বর্গ কিমি) এই পার্কে মোটামুটি হাতি ছাড়া অন্য বড় জন্তু সবই পাওয়া যায়। মোট ৪০০ প্রজাতির পাখীও পাওয়া যায় এখানে। পার্কের তিনদিকে ইলেক্ট্রিকাল ফেন্সিং করা আছে। শুধু দক্ষিন দিকে কোনো বেড়া নেই। ওদিকে আছে বাগাথী নদী এবং তারপর কিতেন্জেলা নামের আরেকটি জংগল আছে যেখান থেকে এখানে বা এখান থেকে সেখানে পশুদের যাতায়াত লেগে থাকে। এই পার্কের জন্ম ১৯৪৬ সালে। 


দক্ষিন দিক ছাড়া বাকি তিনদিকে তাকালে দূরে নাইরোবির গগনচুম্বী অট্টালিকাগুলো দেখা যায়। খালি দক্ষিন দিকে দেখা যায় পাহাড়। এই পার্কের উচ্চতা পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার ফুট। ফলে সারা বছরই একটা ঠান্ডা আমেজ থাকে। 


দুঃখের বিষয় হোলো বছর কয়েক আগে এই জঙ্গলের বুক চিরে চলে গেছে একটি রেললাইন মোম্বাসা বন্দরের দিকে। কেনিয়া আসার আগে নেটফ্লিক্সে বারাক ওবামার ধারাবিবরণী দেওয়া Tsavo National Park এর ওপর ডকুমেনটরী দেখার সময়ও এই লাইনটার কথা শুনেছিলাম। এই লাইনটাই Tsavo ওপর দিয়েও গেছে। ফলে দুই বনেরই অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে।




নাইরোবি ন্যাশনাল পার্কের মধ্যে দিয়ে যাওয়া সেই এলেভেটেড রেল লাইন 


আরও অনেক দুঃখের কথা জানানর ছিল। কিন্তু সেটা পরে হবেখন। সোমবার থেকে শুরু আমাদের এই জঙ্গল থেকে সেই জঙ্গলে দৌড়ে বেড়ান পরবর্তী দশ বারো দিন। এই সাফারিটা ছিল আমাদের একটা ড্রেস রিহার্সালের মতন। সেদিক থেকে বলতে হয় রিহার্সাল সফল। যা যা দেখেছি তার কিছু নমুনা সাথে দিলাম।



White-browed Coucal

রাজদর্শন 

Her Highness


Zebra Family

Rhino Family

মাসাই সুন্দরী


পর্ব


গত পর্বে লিখেছিলাম আরও কিছু দুঃখের কথা রয়ে গেল পরে বলার জন্য। কাজেই দুঃখের কথা দিয়েই শুরু করা যাক।


নাইরবি ন্যাশনাল পার্কে যেদিন গিয়েছিলাম সেদিন ছিল রবিবার। জঙ্গলটার অবস্থানও শহরের উপকণ্ঠে। ফলে প্রচুর ভীড় ছিল সেদিন। কিন্তু মানুষ রূপী কিছু অমানুষের ব্যবহার দেখে আশ্চর্য বেদনাহত হয়েছিলাম। সেদিন সিংহ পরিবার দেখে বেশ কয়েকজন এমন চিৎকার করে উল্লাস প্রকাশ করছিল যে অধিকাংশ সিংহই জঙ্গলের গভীরে চলে গেল। একটি সিংহীকে দেখলাম বিরক্ত হয়ে রাস্তা দিয়েই হাঁটা লাগাল। আমরা হতবাক হয়ে দেখলাম দু তিনটি পর্যটক ভর্তি গাড়ী সিংহীটির পিছু পিছু চলতে লাগল। আমারতো ভয় হচ্ছিল যে সিংহীটি গাড়ী চাপা না পড়ে যায়। জিনিষ আমাদের দেশেও দেখা যায় কিনা সন্দেহ। 


সোমবার, ৩০শে মে, ২০২২ শুরু হোলো আমাদের জঙ্গল সাফারি। সকাল সাতটার কিছু আগেই জর্জ (যে আমাদের নাইরবি ন্যাশনাল পার্কেও ড্রাইভার কাম গাইড ছিল) তার গাড়ী (4 x 4 Toyota Land Cruiser) নিয়ে হাজির হোলো। মালপত্র গাড়িতে তুলে অশোক আর শম্পাকে বিদায় জানিয়ে সকাল ঠিক সাতটা পাঁচে আমরা রওনা দিলাম বিশ্ববিখ্যাত আমাদের স্বপ্নের মাসাইমারার উদ্দেশ্যে। 


নাইরবি থেকে মাসাইমারার দূরত্ব ২৫০ কিমি। জর্জ জানাল মোটামুটি ছয় সাত ঘন্টা সময় লাগবে মাঝে দুটি বিরতি নিয়ে। 


আমাদের প্রথম বিরতি নাইরবি থেকে ঘন্টা দুয়েক চলার পরে Great Rift Valley View Point. এই জায়গাটার কথা আগেও শুনেছি। এটি পৃথিবীর একটি অন্যতম আশ্চর্য  নয় হাজার ছয়শ কিমি দীর্ঘ এই উপত্যকা লেবানন থেকে মোজাম্বিক পর্যন্ত বিস্তৃত। এর নিম্নতম অংশটি সমুদ্র পৃষ্ঠের ১৩০০ ফুট নিচে সর্বোচ্চ অংশটি সমুদ্রপৃষ্ঠের ৬০০০ ফুট ওপরে অবস্থিত। এই উপত্যকাটি ভূতাত্বিক ভাবে খুবই সক্রিয়। এখানে অনেকগুলো উষ্ঞ প্রস্রবন আগ্নেয়গিরি আছে এবং খুবই ভূমিকম্প প্রবণ এলাকা। আমরা যখন ভিউ পয়েন্টে পৌঁছালাম তখন আকাশে প্রচুর মেঘ বেশ ঠান্ডা। কূয়াশা মেঘ থাকার ফলে আমাদের দৃস্টি খুব দূরে পৌঁছালনা। ফলে ছবিও বিশেষ তোলা গেলনা। অল্প কিছু সময় ওখানে কাটিয়ে জর্জের গাড়ী আবার চলতে শুরু করল।



 

কুয়াশাচ্ছন্ন রিফ্ট ভ্যালি 


সকাল দশটার সময় নারকে (নরক নয় 😊) গাড়ী থামল একটি শপিং আর্কেডে। ওখানে Chill Cafe নামের কফি শপে বসে একটু প্যানকেক সহযোগে চা খাওয়া হোলো। এই প্রসংগে জানাই কেনিয়ায় কিন্তু বেশ ভাল মানের চা কফি উৎপাদন হয়। দুটোরই গুণগত মান খুবই উঁচু। চায়ের দেশের লোক হয়েও এবং চা সম্পর্কে বেশ খুঁতখুতানি থাকা সত্বেও বলি যে কেনিয়ার চা কফি দুটোই আমার খুব ভাল লেগেছে। যাইহোক বেলা এগারটায় আবার শুরু হোলো আমাদের যাত্রা। 


মাসাইমারার গেটে গিয়ে পৌঁছালাম বেলা একটা নাগাদ। আমাদের পরবর্তী দুই রাত তিন দিন থাকার আস্তানা Lloyk Mara Luxury Camp যেটি মূল ফটক থেকে আরও পঞ্চাশ কিমি জঙ্গলের ভিতরে অবস্থিত। জঙ্গলের বাইরেও অনেক থাকার জায়গা আছে। স্বাভাবিকভাবেই জঙ্গলের ভিতরের থাকার জায়গাগুলি তুলনামূলক বেশ কিছুটা দামি। গাড়ী পার্ক করে আমাদের তিনজনের পাসপোর্ট একটা ফাইল নিয়ে জর্জ চলে গেল অফিসে। আশেপাশে আরও অনেক গাড়ী দাড়িয়ে। গাড়ী দাঁড়াতেই বেশ কিছু সুসজ্জিত মাসাই মহিলা চলে এলো বিভিন্ন পসরা নিয়ে। মুখে বুলিজাম্বো অনুরোধ করছিল তাদের সেই পসরাগুলি (মুখোশ, গয়না, মাসাই লাঠি ইত্যাদি) কেনার জন্য। শম্পা পইপই করে বলে দিয়েছিল আমরা যেন কোথাও কিছু না কিনি কারণ অবশ্যই আমরা ঠকে যাব। তাছাড়া সব কিছুই নাইরাবিতে পাওয়া যায় অনেক কম দামে। অগত্যা আমরা হাসিমুখেই ইশারায় আমাদের অপারগতা জানাতে লাগলাম। বেশ কিছু সময় পরে জর্জ ফর্মালিটি শেষ করে ফিরে এলো আমাদের পাসপোর্ট ফিরিয়ে দিল। 


তারপর গাড়ী গড়াতে শুরু করল আমাদের সেই স্বপ্নের মাসাইমারার গেটের দিকে।


পর্ব


গত তিন বছরের সমস্ত আলোচনা, পরিকল্পনা, স্বপ্ন দেখা সব কিছু সফল করে জর্জের গাড়ী আমাদের নিয়ে মাসাইমারার মূল ফটক পেরিয়ে বিশ্বের বন্যপ্রানীপ্রেমী ফটোগ্রাফারদের মক্কায় প্রবেশ করে গেল। সারা শরীরে কেমন যেন একটা রোমাঞ্চ অনুভব করলাম।


ভিতরের রাস্তা কাঁচা তবে মোটামুটি সমান। মিঠে রোদের আলোয় চারপাশ উজ্জ্বল। আবহাওয়া বেশ আরামদায়ক ঠান্ডা। মাসাইমারা নামেই জঙ্গল, আসলে সবুজ ধূসর ঘাসে ঢাকা পাহাড়ী এক তেপান্তরের মাঠ, যা সাভানা (savanna) নামে পরিচিত। গাছপালার বিশেষ বালাই নেই। ঝোপঝাড় রয়েছে। ঘাসগুলো বেশীরভাগই বেশ ঘন আর উঁচু, যার মধ্যে ওত্ পেতে থাকে বিপদ। মাঝেমাঝে অনেক দূরে দূরে কিছু ছাতার মতন দেখতে আকাসিয়া গাছ দেখা যায়। পরে জর্জের কাছে জেনেছিলাম যে গাছগুলো দেখেই নাকি গাড়ীচালকরা পথের দিশা পায়। এই বনাঞ্চলের সৌন্দর্য অপরিসীম। কেন মাসাইমারা এ্যাতো জগৎবিখ্যাত, কেন লোকে এখানে বারেবারে আসতে চায়, সেটা এখানে না এলে অনুধাবন করতে পারতামনা। এর সৌন্দর্য ভাষায় প্রকাশ করা আমার ক্ষমতার বাইরে। চেষ্টা করব কিছু ছবি দিয়ে সেই ঘাটতি পুষিয়ে দিতে।


কিছু জরুরী তথ্য দেখে নেওয়া যাক। মাসাইমারার অবস্থান কেনিয়া তানঞ্জানিয়ার বর্ডারে। আসলে একই জঙ্গলের কেনিয়ার অংশের নাম মাসাইমারা আর তানঞ্জানিয়ার অংশের (যেটি আয়তনে অনেক বেশী বড়) নাম সেরেঙ্গেটি। আমাদের দেশে যেমন সুন্দরবন ভারত বাংলাদেশ দুদিকেই আছে। আবার দক্ষিনভারতে একই জঙ্গলের কর্ণাটকের অংশের নাম বন্দিপুর আর তামিলনাড়ু অংশের নাম মুদুমালাই সেরকমই আরকি। স্থানীয়রা মাসাইমারাকে উল্লেখ করে শুধু মারা নামে। মারা নামের একটা নদীও বয়ে গেছে এই জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যার একদিকে কেনিয়া আর অন্যদিকে তানঞ্জানিয়া। ১৯৬১ সালে এখানে wildlife sanctuary করা হয় ১৯৭৪ সালে এটি national reserve এর মর্যাদা পায়। এই game reserve বর্তমানে Narok County Council এর প্রশাসনাধীন। প্রাথমিকভাবে এর আয়তন ছিল 1821 square km যার থেকে কিছু এলাকা পরে স্থানীয় মাসাইদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়। রিজার্ভের বর্তমান আয়তন 1510 square km. মারা নদী ছাড়া আরও দুটি নদী স্যান্ড তালেকও বয়ে গেছে মাসাইমারা বুক দিয়ে যেগুলি এই বনাঞ্চলকে সজীব থাকতে সাহায্য করে। 


এখানে যা দেখার সব গাড়ী চড়ে। (পকেটে ভাল রকমের রেস্ত থাকলে অবশ্য বেলুনে চড়ে দেখারও সুব্যবস্থা আছে) কোথাও গাড়ী থেকে নামা বারণ। কেউ নামলেই কি করে যেন খবর পেয়ে রেঞ্জার এসে হাজির হয় সদলবলে। ব্যাস্, তারপরেই আকাশছোঁয়া জরিমানা বার করতে হবে পকেট থেকে। না দিতে পারলে ঘাড় ধরে জঙ্গল থেকে বহিস্কার। এই নিয়ম সবাই মানতে বাধ্য এবং মেনেও চলে। ব্যতিক্রমী হচ্ছেন আমাদের প্রতিবেশী দেশ চিনের কিছু নাগরিক। শুনেছি তারা জোর করে নেমে পরে এবং ধরাও পরে। তাদের নিয়মভাঙ্গার এক কান্ড আমরা নিজের চোখেও দেখেছি অন্য এক জঙ্গল Amboseli তে। পরে সেকথা বলব।


গাড়ী গেট পেরিয়ে একটু ঢোকার পর থেকেই শুরু হয়ে গেল দুপাশের বন্যপ্রান দর্শন, মূলতঃ বিভিন্ন রকমের হরিণ, জেব্রা, বুনো মোষ, জিরাফ, দাঁতাল বন্যশূকর অজস্র পাখী ইত্যাদি। আমাদের ক্যাম্পে পৌঁছানর আগে হায়নার দর্শনও পেলাম। তবে সবই চোখে দেখা। ছবিতোলা গেলনা কারণ ক্যামেরা টেলিলেন্স তখন বাক্সবন্দি। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে একজায়গায় দেখাল আমাদের ক্যাম্প আর কিমি দূরে। তারপরেই জর্জ পথ হারাল। যে গাছগুলো দেখে পথের দিশা ঠিক করছিল সেখানে একটা হিসাবের গোলমাল করে ফেলে। ফলে রাস্তা হারায়। আমরা তখন ভাবছি যে কিভাবে আমরা পৌঁছাব। রাস্তায়তো আর লোকজন নেই যে তাদের কাছ থেকে রাস্তা জেনে নেব। যাই হোক স্থানীয় ভাষায় অগুন্তি ফোনের আদানপ্রদান পর্ব শেষে এবং অবশেষে পর্যটকবাহী একটি গাড়ীর দেখা পেয়ে তাদের থেকে পথ নির্দেশ নিয়ে যখন Loyk Mara Luxury Camp গিয়ে পৌঁছালাম তখন ঘড়িতে সময় দুপুর আড়াইটে। প্রথম দর্শনেই বুঝলাম আমাদের সব কষ্ট সার্থক। জঙ্গলের মধ্যে এই রকম একটা জায়গায় থাকার অভিজ্ঞতাটা অন্যরকম হতে চলেছে, সেটা যে কতটা অন্যরকম রোমাঞ্চকর সেটা আরও পরে বোধগম্য হোলো।


গাড়ী থেকে রিসেপশন তাঁবুর সামনে নামতেই হাসি মুখে কয়েকজন এগিয়ে এসে জাম্বো বলে স্বাগত করল। এগিয়ে দিল সুগন্ধি মাখান গরম তোয়ালে। সেই দিয়ে ভাল করে হাত মুখ মুছে বেশ ফ্রেশ লাগল। তারপর এলো স্বাগত পানীয় হিসাবে টাটকা ফলের রস। অতঃপর চেক ইন প্রক্রিয়া শেষ করে আমাদের তিনজনের জন্য নির্দিষ্ট তাঁবুর উদ্দেশ্যে যাওয়া। মোট ষোলোটি তাঁবু আছে। এছাড়া আছে একটা বড় তাঁবু যাতে আছে, বার, ডাইনিং হল আর কিচেন। একটা সুইমিং পুলও আছে। দুটি তাঁবুর মধ্যে খানিকটা দূরত্ব বজায় রাখা আছে। আমাদের তাঁবুর থেকে ডাইনিং হলের দূরত্ব প্রায় ১০০ মিটার। তাঁবুর সামনের অংশে একটা প্রশস্ত বারান্দা। তাঁবুগুলো বেশ বড়ই। ভিতরে তিনটি খাট পাতা, দুটি সিংগল, একটি ডবল। এছাড়া আলাদা এ্যাটাচড্ টয়লেট বাথরুম। কিছু নিয়ম বলে দিল অবশ্য পালনীয় হিসাবে। সন্ধ্যার পরে তাঁবুর বারান্দার বাইরে পা রাখা যাবেনা। নটার মধ্যে রাতের খাওয়া শেষ করতে হবে। খেতে যাবার সময় বিকালে গেম ড্রাইভ সেরে ফেরার সময় জানিয়ে রাখতে হবে। সেই সময় মাসাই প্রহরী এসে পাহাড়া দিয়ে নিয়ে যাবে খাওয়া শেষ হলে পৌঁছে দিয়ে যাবে। রাত নটার পরে বাইরের বারান্দাতেও বসা নিষেধ। এই রকম একটা রোমাঞ্চকর নির্দেশ শুনে তারপর লাঞ্চ করতে যাওয়া হোলো।





লয়ক মারা ক্যাম্পে আমাদের তাঁবু 



তাঁবুর অভ্যন্তরে


পর্ব


চারদিকে দিনের আলো, কাজেই নিজেরাই চলে গেলাম ডাইনিং রুমে। খেতে খেতেই দেখলাম সামনেই জেব্রা হরিণ ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই প্রসঙ্গে বলে রাখি, আমাদের ক্যাম্পের চারদিকে কিন্তু কোনও রকমের বেড়া নেই।


এখানে পৌঁছানর আগেই জর্জ বলে রেখেছিল যে আমাদের প্রথম গেম ড্রাইভ শুরু হবে সাড়ে তিনটের সময়। পরের দিন আমরা ব্রেকফাস্ট করে প্যাকড্ লাঞ্চ সাথে নিয়ে আটটায় বেরিয়ে যাব গেম ড্রাইভে ফিরব একেবারে সন্ধ্যায় সাড়ে ছটার সময়। তারপরের দিন গেম ড্রাইভ শুরু হবে সকাল সাড়ে ছটায়। নটার সময় ফিরে এসে ব্রেকফাস্ট করে চেক আউট।


সেই মতন ৩০শে মে, ২০২২ ঠিক সাড়ে তিনটের সময় শুরু হোলো প্রথম গেম ড্রাইভ। তার আগেই জর্জ গাড়ীর মাথাটা খুলে রেখেছিল দেখা ছবি তোলার সুবিধার জন্য। কাঁচা রাস্তা ধরে গাড়ী চলতে শুরু করল। হয় প্রধান সড়ক দিয়ে গাড়ী চলবে নয়তো মাঠের মধ্যে দিয়ে গাড়ী চলার রাস্তা দিয়ে চলবে। মাঠের মধ্য দিয়ে যে গাড়ী চলার রাস্তা, সেগুলো অনেক জায়গাতেই খুবই ভয়ংকর। একতো বৃষ্টিতে মাটি ভেজা, তার ওপর অনেক জায়গাতেই রাস্তা বলতে শুধুই পাথর। তার ওপর দিয়ে গাড়ী যখন চলে তখন প্রচন্ড দুলুনি হয়। জর্জ অত্যন্ত দক্ষ চালক। বেশ কয়েকবার এমন ভাবে গাড়ী গাড্ডা থেকে বার করে নিয়ে গেছে যে আমি মুগ্ধ।


গেম ড্রাইভের শুরুর দিকে বেশ কিছু জেব্রা বিভিন্ন রকমের হরিণ দেখার পর হঠাৎ চোখে পড়ল একদল Banded Mongoose, সার দিয়ে চলেছে দ্রুত গতিতে। কোন রকমে তাদের ছবি তুললাম। এরপর চোখে পড়ল এক জোড়া হায়না। হঠাৎই দূর থেকে চোখে পড়ল জিরাফ। লম্বা গলা বাড়িয়ে একটা গাছ থেকে পাতা খাচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন রকমের পাখীর দেখা পড়ছিল। তারই মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হোলো Secretary Bird. এই বিশেষ ধরণের শিকারি পাখীগুলো আফ্রিকার সাভানাতেই পাওয়া যায়। মাথায় অদ্ভুত রকমের ঝুঁটি। আগেকার দিনে secretary রা নাকি মাথায় ঐরকম ঝুঁটি বাঁধত, সেই থেকে এদের এই নাম। এক জায়গায় অনেক দূরে গাছের মাথায় দেখা পেলাম Snake Eagle এর। এরপর একটা ছোট খালের মধ্যে দেখা মিলল এক ঝাঁক জলহস্তীর। কিন্তু তাদের শরীরের অধিকাংশই  জলের তলায়। এই প্রসংগে জানিয়ে রাখি এখানে লোকে সবচেয়ে বেশী ভয় পায় এই পশুটিকে। এরা বিনা প্ররোচনায়া মানুষকে আক্রমণ করে মেরে ফেলে। বিভিন্ন জঙ্গলে দেখেছি যেখানে হিপো পুলের কাছে হেঁটে যাবার ব্যাপার থাকে সেখানেই বন্দুকধারী প্রহরী সাথে যায়। পথে দেখা মিলল এক ঝাঁক Crowned Lapwing এর। যেখানেই নতুন ধরণের পাখী দেখতে পাচ্ছি, জর্জকে বললেই গাড়ী দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে ছবি তোলার জন্য। অনেক সময়ই আবার নিজেই পাখী দেখতে পেয়ে আমার দৃষ্টি আকর্ষন করছে। 



কমন ওয়ার্থগ


হায়না


সেক্রেটারি বার্ড 


এইভাবে পশুপাখি দেখতে দেখতে এক জায়গায় গিয়ে দেখতে পেলাম একটা জলহস্তী সামনে মাঠের ওপরেই কিন্তু খানিকটা দূরে ঘাসের মধ্যে। কাজেই এরও ছবি নেওয়া গেলনা। তারপরই এলো সেই প্রতীক্ষীত মূহুর্ত। একজায়গায় দেখা গেল একটা ঝোপের কাছে তিনটে গাড়ী পর্যটক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সেই দেখে জর্জও তাড়াতাড়ি গাড়ীগুলোর পাশে গিয়ে দাঁড়াতে দেখি সামনেই একটা ঝোপের আড়ালে তিনটে সিংহ একটা বুনো মোষ মেরে খাচ্ছে। কিন্তু তখন সূর্যাস্ত হয়ে গেছে, আলোও কমে গেছে। ফলে ভাল ছবি তুলতে পারলামনা। কিছু পরে দেখি তিনটে সিংহের একটা খাওয়া শেষ করে ঝোপের আড়াল থেকে বেড়িয়ে এসে আমাদের গাড়ীর পাশ দিয়ে গিয়ে সামান্য দূরে গিয়ে বসে নিজের থাবা পরিস্কার করতে লাগল। চারপাশে এ্যাতো মানুষ, গাড়ী অথচ সে সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত। থাবা পরিস্কার করে রাজকীয় স্টাইলে বসে এদিক ওদিক দেখতে লাগল। যেন বিভিন্ন দিকে থাকা মানুষদের ছবি তুলতে পোজ্ দিচ্ছে।



ভোজ সেরে রাজামশাই তৃপ্ত 


সাড়ে ছটা নাগাদ ক্যাম্পে ফিরে সোজা তাঁবুতে। বেশ ঠান্ডা। তবে কলে সর্বক্ষণ গরম জল থাকে। কাজেই ভাল করে স্নান করে নিতেই শরীর ঝরঝরে। সারাদিনের ক্লান্তি নিমেষে দূর। সোওয়া আটটার সময় মাসাই গার্ড বেশ জোরাল টর্চ আর বর্শা হাতে নিয়ে হাজির। আমাদের সাথে নিয়ে ডাইনিং রুমে পৌঁছে দিল। খাওয়া শেষ হতে আবার সাথে করে তাঁবুতে ফেরত হলাম। ফেরার পথে ঝমঝম্ করে বৃষ্টি নেমে গেল। কোনরকমে দ্রুত পা চালিয়ে মাসাই পাহাড়ায় তাঁবুতে ফেরা গেল। তাঁবুতে ফিরে দেখি আমরা যখন খেতে গেছি তখন ক্যাম্পের কর্মচারীরা এসে সমস্ত জানালায় পর্দা বন্ধ করে, মশারী টাঙ্গিয়ে, কম্বলের তলায় হট্ ব্যাগ রেখে গেছে সবার জন্য। ঠান্ডার মধ্যে কম্বলের তলায় হট্ ব্যাগ থাকায় বিছানায় পড়া মাত্র ঘুম এসে গেল। 



মাসাই প্রহরী

কতক্ষন ঘুমিয়েছি মনে নেই। ঘুম ভেঙ্গে গেল কাছাকাছি কোথাও সিংহের গর্জনে। বেশ কিছু সময় ডেকে সে শান্ত হোলো কিন্তু আমাদের ঘুমের দফারফা ততক্ষণে। পরে আবার শুনি অন্য আরেক রকমের ডাক। খেয়াল করে বুঝলাম সেটা জলহস্তীর ডাক। ভয়ে মাথা অবধি কম্বলে ঢেকে চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইলাম। কখন যে আবার ঘুমিয়ে পরেছিলাম খেয়াল নেই। ঘুম ভাঙ্গল হরেকরকমের পাখীর ডাকে।


পর্ব


পরের দিন, অর্থাৎ ৩১শে মে, ২০২২, সকালে উঠে তৈরী হয়ে নিয়ে ব্রেকফাস্টে যাবার আগে ক্যামেরা হাতে ক্যাম্পের মধ্যেই ইতিউতি পাখী দেখে ও ছবি তুলে বেড়াচ্ছিলাম। সেই সময় একজন মাসাই গার্ড এসে গল্প জুড়ল। জিজ্ঞাসা করল কাল রাতে সিংহ আর জলহস্তীর ডাক শুনেছেন? হ্যাঁ বলাতে বলল কাছেই এসেছিল। তারপর আমার লেন্সটা দেখে বলল এটা দূরের না কাছের (মানে টেলি না ওয়াইড জিজ্ঞাস্য বুঝলাম)। আমি টেলি বলাতে ক্যাম্পের বাইরে একটা টিলার ঢালের দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বলল ক্যামেরা চোখে দিয়ে ওদিকে দেখুন। আমি তাই করে দেখলাম সত্যিইতো, গোটা চার পাঁচ সিংহ সিংহি নিজেদের মধ্যে খেলা করছে। চোখ বটে মাসাইর। তারপর ক্যাম্পের মাটিতে পায়ের দাগ দেখিয়ে বলল বুফেলো (এদেশে বাফেলো কে বুফেলোই বলে) এসেছিল ভোরে। যাই হোক আমি ওর সাথে খানিক খোস গল্প করলাম। ওর নাম উইলিয়াম। ওর দুটো বউ। প্রত্যেকের চারটি করে সন্তান। আমাদের একটা করে শুনে অবাক হোলো খুবই। আমাদের সম্পর্কে কি ভাবল কে জানে। ওকে ওর হাতের বর্শাটা দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম এটা কখনও ব্যবহার করেছ? বলল অনেক বারই। সিম্বাকে (সিংহ) ভয় দেখানর জন্য ব্যবহার করতে হয়েছে।


ব্রেকফাস্ট সেরে জর্জের গাড়ীতে উঠে পড়া গেল। ইতিমধ্যে কাম্পের কর্মচারীরা গাড়ীতে প্যাকড্ লাঞ্চ তুলে দিয়েছে। গাড়ী চলল আবার সেই নাচতে নাচতে দুলতে দুলতে জেব্রা, হরিণ, জিরাফ, বুফেলোদের পাশ কাটিয়ে। মনে মনে হাসি পাচ্ছিল যে একদিন আগে প্রথম যখন ঐ জীবগুলোকে দেখি তখন কত ছবিই না তাদের তুলেছি আর একদিনের মধ্যেই এদের আমাদের দেশের গরু, ছাগল, মোষের মতন মনে হচ্ছে। দেখছি অথচ ক্যামেরা তাক করছিনা।



মাসাইমারার একটি কমন দৃশ্য 


মাসাইমারাতে সারা বছরই Big Five (lion, leopard, elephant, Cape buffalo, rhino) পাওয়া যায়। যদিও লেপার্ড আর গন্ডারের দর্শন মাসাইমারাতে আমরা পাইনি। জলহস্তী আর কুমীড় প্রচুর সংখ্যায় থাকে মারা ও তালেক নদীতে। এর বাইরেও অনেক মাংসাসী জন্তু এখানে পাওয়া যায়, যেমন হায়না, চিতা, বিভিন্ন প্রজাতির শিয়াল, নেকড়ে, বুনো বিড়াল ও বুনো কুকুর। বুনো কুকুরের সংখ্যা এখন কমে গেছে কারণ এক ধরণের রোগে অনেক কুকুর মারা গেছে। তার ওপর ওরা সিংহের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পেরে ওঠেনা।


Wildebeest, topi, zebra আর Thompson’s gazelle প্রতি বছর জুলাই থেকে অক্টোবর মাসে সেরেঙ্গেটি থেকে মারা নদী পেরিয়ে মাসাইমারাতে প্রবেশ করে। এরই নাম হোলো Migration. এ এক বিশ্ববিখ্যাত আশ্চর্যজনক ঘটনা। এই মাইগ্রেশন দেখার জন্য হাজার হাজার পর্যটক ঐ সময় মাসাইমারাতে বা সেরেঙ্গেটিতে ভীড় করে। আমাদের এই ভ্রমণ হবার কথা ছিল ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে অর্থাৎ মাইগ্রেশনের সময়। কিন্তু অতিমারির জন্য সে পরিকল্পনা বাতিল করতে হয়। এই বছর যেহেতু কেনিয়াতে নির্বাচন ও রাজনৈতিক অস্থিরতার সম্ভাবনা রয়েছে সেহেতু অশোকের পরামর্শ মতন আমাদের এবারের ভ্রমণসূচী এই সময় করতে হোলো। তাতে একটা সুবিধা পাওয়া গেল। প্লেনভাড়া বা ভ্রমণ খরচ অনেকটাই কমে হয়ে গেল। 


জন্তু জানোয়ার ছাড়াও ৪৭০ রকমের পাখী পাওয়া যায় মাসাইমারাতে। এর মধ্যে secretary bird, crowned crane, vultures, hornbill, eagles, falcons, ostritches আর lilac-breasted roller (কেনিয়ার জাতীয় পাখী) অনেক দেখা যায়।


আমাদের গাড়ী ঘুরতে ঘুরতে এক জায়গায় পৌঁছাল যেখানে দেখি একটা বড়সড় হরিণ, মনে হোলো eland, মেরে রেখে গেছে সিংহরা। আশেপাশেই কোথাও রয়েছে হয়তো। কিন্তু জর্জ এখানে অপেক্ষা করতে রাজি হোলোনা। আরও অনেক জায়গায় যেতে হবে। কয়েকটা গাড়ী দাড়িয়ে রইল। এরপর এক জায়গায় কয়েকটা topi র দেখা মিলল। দুটো topi দেখি নিজেদের মধ্যে শিং এ শিং লাগিয়ে লড়াই করছে। সে বড় মজার দৃশ্য। দুজনে মাথা মাটির কাছে শিং নামিয়ে অপরের শিং এর কাছে নিয়ে যাচ্ছে। তারপরই আবার দুজনে সোজা দাড়িয়ে এদিক ওদিক দেখছে। বেশ কিছু পরে আবার দুজনে লড়াই বা মকফাইট করছে। বেশ খানিকটা সময় নিয়ে এই মজার দৃশ্যের ছবি ও ভিডিও নিলাম। চেষ্টা করব দেখাতে।



টোপীর লড়াই 



Common Eland

এর পরের জায়গায় দূর থেকেই অনেক গাড়ী দেখা যেতেই বুঝলাম কি দেখতে চলেছি। যথারীতি ওখানে পৌঁছে দেখি চারটে সিংহ আর একটা সিংহী ব্রেকফাস্ট করছে। কি দিয়ে বলতে পারবনা কারণ ততক্ষণে অনেকটাই খাওয়া হয়ে গেছে। তবে একটা ব্যাপারে দেখলাম এদের সাথে মানুষদের খুবই মিল। দলে একটা সিংহী আর চারটে সিংহ। দেখলাম সিংহরা মাংসের ভাল ভাল পিস্ গুলো খাচ্ছে আর সিংহীটা হাড় চিবোচ্ছে। একেবারে মনুষ্য সংসারের গল্প। বাড়ীর ছেলেদের পেট ভরিয়ে খাইয়ে তারপরে গিন্নীমা অবশিষ্ঠ যা আছে তাই দিয়ে পেট ভরায়। একটা মজার ব্যাপার দেখলাম। একটা শিয়াল এসে হাজির হোলো। কোনো ভয়ডর নেই। সোজা একটা সিংহের কাছে গিয়ে তার খাবারে ভাগ বসাতে চাইল। সিংহটা বেশ কয়েকবার ক্রোধ প্রকাশ করার পরও যখন শিয়ালটা চলে গেলনা তখন সিংহটাই মাংস মুখে নিয়ে সরে গিয়ে বসল।



গিন্নিমার হাড় চিবানো 


সকাল সকাল ঠান্ডার মধ্যে বেরোনো হয়েছে। তারপর অনেকটা সময় কেটে গেছে। ফলে সবারই একবার প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেবার প্রয়োজন। অথচ গাড়ী থেকে নামার উপায় নেই। জর্জকে বলতে ও বলল একটু অপেক্ষা করতে। তারপর গাড়ী নিয়ে গেল একটা এয়ার স্ট্রীপে, সাভানার মধ্যেই। এই রকম মোট তিনটে এয়ারস্ট্রীপ আছে। ছোট বিমান এখানে ওঠা নামা করতে পারে নাইরবি আর মোম্বাসা থেকে পর্যটক নিয়ে। আগে তাঞ্জানিয়া থেকেও আসত, কোভিডের পর এখনও সেটা চালু হয়নি। বেশ ব্যস্ত বিমান বন্দর দেখলাম। স্বল্প সময়ের মধ্যেই অনেকগুলো প্লেন নামল ও উঠল।


এরপর সারাদিন ধরেই চলল পশু দেখা আর আমার পাখী দেখাও। বিশেষ উল্লেখযোগ্য হোলো Southern Ground Hornbill দেখা। রাস্তার পাশে ঝোপের মধ্যে খাবার খুঁজছিল, ভাল করে ছবি তুলতে পারছিলামনা কিছুতেই। ও আমার সুবিধা করে দিয়ে ঝোপ থেকে মুখে করে খাবার নিয়ে বেড়িয়ে এসে রাস্তার ঠিক মাঝে দাড়িয়ে ছবির জন্য বেশ খানিকটা পোজ্ দিল। মন ভরে ছবি তুললাম।



Southern Ground Hornbill


মাঝে হোলো লাঞ্চ ব্রেক।



পর্ব


লাঞ্চের জন্য খোলা মাঠে একটা গাছের নীচে গাড়ী দাঁড় করাল জর্জ। তার আগে বেশ ভাল করে চারপাশটা দেখে নিল। গাছটার ডালে একটা Lilac-breasted Roller ছাড়া আর কোনো জীব জন্তু চোখে পড়লনা। পরে জর্জের কাছে শুনেছি যে এই ব্যাপারেও একটা নিয়ম আছে। গাড়ী সেখানেই গাছের নীচে দাঁড় করান যাবে যেখানে ঘাস ছোট ছোট। 


প্যাকড্ লাঞ্চ নামেই, হোটেল থেকে এলাহী ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। এমনকি গরম চা কফি পর্যন্ত। জর্জ মাসাই কায়দায় মাটিতে শুখা (মাসাইদের পরিধেয় বস্ত্র কাম গায়ের চাদর) পেতে মাটিতে বসে খেতে বলছিল। কিন্তু তিনজনেরই মাটিতে বসার অসুবিধা, অগত্যা আমরা গাড়িতে বসেই খেলাম যতটা পারি। বাকি অতিরিক্ত খাবার জর্জ সুন্দর করে আবার প্যাক্ করে নিল, ফেরার সময় মাসাই গ্রামের গরীব বাচ্চাদের দেবার জন্য। সেটা যখন হয়েছিল, মানে বাচ্চাদের খাবার দেওয়া হোলো তখন তাদের মুখে যে উজ্জ্বল হাসি দেখেছিলাম সে দেখার অভিজ্ঞতা মাসাইমারায় বন্যপ্রাণী দেখার অভিজ্ঞতার থেকে কোনো অংশে কম নয়।


এখানের প্রত্যেক জঙ্গলই অত্যন্ত পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। কেউ কোনো রকমের জিনিষ জঙ্গলে ফেলে রেখে যায়না। আমরাও একটা লজেন্স খেলেও তার মোড়কটা নিজেদের পকেটে ভরে নিচ্ছিলাম। আরেকটা জরুরী তথ্য, কেনিয়া একটি প্লাস্টিক বর্জিত দেশ (আমরা যে কবে হতে পারব!)


লাঞ্চের পরে তাঞ্জানিয়া বর্ডারের দিকে যাওয়া হোলো মারা নদী দেখার জন্য যেখান দিয়ে মাইগ্রেশনের সময় আগের পর্বে উল্লেখ করা জন্তুরা পারাপার করে। তারপরের গন্তব্য হিপো পুল। যদিও যথারীতি তেনারা জলের তলায়। একটা কুমীড়ও পেলাম, রোদ পোয়াচ্ছে। ফাঁকে ফাঁকে বেশ কিছু পাখীও পেয়ে গেলাম।


মারা নদীর কুমির 





জলমগ্ন জলহস্তী 



এখানে বনদপ্তরের কর্মীরা খুবই সজাগ। মাঝে মাঝেই তাদের দেখা পাচ্ছিলাম গাড়ী চড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। প্রথমেই হাসিমুখে (কেনিয়ায় এসে গোমড়ামুখো মানুষ প্রায় দেখিনি বললেই চলে, এঁরা সদাহাস্যময়) আমাদের গাড়ী দাঁড় করিয়ে জর্জকে সম্ভাষন করছে। তারপর হাসিমুখেই অনেককথা বলছে (আমাদের মনে হচ্ছিল খোস গল্প করছে), তারপর হাত বাড়িয়ে আমাদের পারমিট চেয়ে নিয়ে পরীক্ষা করছে। পরে জর্জ বলেছিল যেটা আমাদের খোশগল্প মনে হচ্ছিল সেটা আসলে আমাদের সম্পর্কে খোঁজ খবর নিচ্ছিল, মানে আমরা ভাল লোক কিনা, কোনও রকম অন্যায় আবদার করছি কিনা, গাড়ী থেকে নেমেছি কিনা ইত্যাদি ইত্যাদি।


সাড়ে ছটা নাগাদ আবার ক্যাম্পে ফিরে স্নান, বিশ্রাম, আড্ডা তারপর নৈশভোজে যাওয়া। আজ একজন নয়, দু দুজন মাসাই প্রহরী, একজন আগে একজন পিছনে। কারণটা খানিক পরেই টের পেয়েছিলাম। সেদিন ডিনার শেষে ফিরে শয্যাগ্রহন করার সাথে সাথেই শুরু হয়ে গেল সিংহের গর্জন। এবার অনেক কাছে। সেদিন আমি সাফল্যর সাথে সেই গর্জন রেকর্ড করতে পেরেছিলাম মোবাইলে। পরদিন ভোরে ঘুম ভাঙ্গল পাখীর ডাকে। 


মাসাইমারায় সূর্যোদয় 


সেদিন, অর্থাৎ ১লা জুন, ২০২২ সকাল সকাল, সাড়ে ছটার সময় এক কাপ চা আর দুটো বিস্কুট খেয়ে গেম ড্রাইভে বেরোনো হোলো। শুরুতেই এক অপূর্ব সুন্দর সূর্যোদয় দেখলাম। তারপরই সিংহের ডেয়ার। তিন চারটে শাবক খেলা করছে নিজেদের মধ্যে। মাঝেমাঝে বাড়াবাড়ি করে ফেললে মায়ের মৃদু ধমক খাচ্ছে। আমার নজর অবশ্য সেখানে উপস্থিত আরও কয়েকটি চরিত্রের দিকে। একটা শিয়াল হাজির হয়েছে ওদের খাবারের ভাগ নিতে। এছাড়া উপস্থিত একঝাঁক শকুন। 


চপল বালক 

ক্যাম্পে ফেরার পথে একটা গাছের মগডালে আবার দেখলাম একটা snake eagle আর তারপরে একটা সাপও দেখলাম রাস্তার ওপর। 


Snake Eagle


ক্যাম্পে ফিরে ব্রেকফাস্ট করে জিনিষপত্র গুছিয়ে মাসাইমারাকে বিদায় জানিয়ে জর্জের গাড়ী নাইরবির রাস্তা ধরল।



পর্ব ১০


মাসাইমারাতে আমরা বিগ ফাইভের মধ্যে দু রকম অর্থাৎ গন্ডার আর লেপার্ড দেখতে পাইনি। আর চিতাও দেখতে পাইনি। জর্জকে একথা বলায় বলল এই ট্যুর শেষে তোমরা দেশে ফেরার আগে গন্ডার আর চিতা দেখানর গ্যারান্টি আমি দিচ্ছি। লেপার্ডের কথা অবশ্য দিচ্ছিনা কারণ লেপার্ড দেখা অনেকটাই কপালের ব্যাপার (অনেকটাই সুন্দরবনে বাঘ দেখার মতন) জর্জের এই সংকল্পকে পাথেয় করে মাসাইমারা ছাড়লাম। 


একই রুটে ফেরা। ঘটনাবিহীন যাত্রা। রিফট্ ভ্যালির ছবি এবারও তোলা গেলনা। প্রায় চারটে নাগাদ আমরা পৌঁছে গেলাম অশোক শম্পার বাড়ী। একরাতের বিশ্রাম। পরের দিন আবার যাত্রা বিভূতিভূষনের চাঁদের পাহাড়ের উদ্দেশ্যে। 


আমার এই ভ্রমণ অভিজ্ঞতায় বারেবারে ফিরে আসছে জর্জের নাম। এবার ওর সম্পর্কে দু কথা না বললে এবং ওর ছবি না দিলে  কাজটা ঠিক হবেনা মনে হয়। 


ষাট বছরের জর্জ একজন devout Christian. লম্বা ঋজু চেহাড়া, এদেশের অধিকাংশ পুরুষের মতনই মুন্ডিত মস্তক। এই এজেন্সীর সাথে ড্রাইভার কাম গাইড হিসাবে যুক্ত গত এগারো বছর ধরে। তার আগে স্কুলবাস চালাত। গাইড হিসাবে কাজ শুরু করার জন্য ওঁকে পড়াশুনা করে পরীক্ষা দিয়ে লাইসেন্স পেতে হয়েছে যেটা তিন বছর অন্তর আবার রিনিউ করতে হয়। ওর গাড়ীতেই অনেক রকমের বই পত্র (field guidebooks) মজুত থাকে, যেগুলো কখনও কখনও রেফার করে আমাদের কোনো জন্তু বা পাখী সম্পর্কে বুঝিয়ে দিত। মদ ছোঁয়না। সিগারেট আগে খেতো, এই কাজ শুরু করার পর সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা হোলো একজন চমৎকার মানুষ। মাঝে আমার দুদিন শরীর একটু খারাপ হয়েছিল। তখন যেভাবে আমার যত্ন করেছিল আমি কোনোদিন ভুলতে পারবনা। ক্যাম্পের chef কে ডেকে আমার জন্য আলাদা করে খাবারেরও ব্যবস্থা করেছিল। আর chef হাসিমুখে চমৎকার ভারতীয় খাবার তৈরী করে দিয়েছিল। যা খেয়ে শরীর চাঙ্গা। বিভিন্ন গেম ড্রাইভে দেখেছি আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বন্যপ্রাণী বা পাখী দেখানর জন্য। জর্জের অভিজ্ঞতা, সততা, কাজের প্রতি নিষ্ঠা সব কিছুর জন্যই আমাদের কেনিয়া ভ্রমণ এ্যাতো সুন্দর সফল হতে পেরেছে। 


জর্জের সাথে সেলফি 


আমাদের এই ভ্রমণের সব ব্যবস্থা করেছে Kustom Travels, নাইরবিরই একটি ভ্রমণ সংস্থা। এব্যাপারেও আমরা অশোকের ওপরেই নির্ভরশীল ছিলাম একজন reliable agent খুঁজে দেবার জন্য। আমরা এই ভ্রমণের পরিকল্পনা যখন করি সব রকম অপশনই যাচাই করে নিয়েছিলাম। প্রথমে ভারতীয় সংস্থাদের প্যাকেজ ট্যুরের খোঁজ নিয়েছিলাম। আমাদের মতন করে customised tour এর খোঁজ নিয়েছিলাম। কেনিয়ার কয়েকটি এজেন্টের সাথেও সরাসরি যোগাযোগ করেছিলাম। পরিশেষে অশোকই এই Kustom Travels এর খোঁজ দেয়। খুবই বিশ্বাসযাগ্য ভ্রমণ সংস্থা। ২০২০ সেপ্টেম্বরে আমাদের এই বেড়ানোটা বাবার কথা ছিল। Kustom Travels কে সমস্ত দেয় টাকা ডলারে দেওয়া হয়ে গিয়েছিল। তারপর কোভিডের জন্য সব বাতিল। ওরা কিন্তু একটা ডলারও কাটেনি। জমা রেখে দিয়েছিল। এবারের বিলের সাথে জমা থাকা ডলার adjust করে নিয়েছে। অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি কেনিয়ার ভাল এজেন্টের মাধ্যমে ব্যবস্থা করলে অপেক্ষাকৃত কম খরচে ভাল বেড়ান হবে। বিমানের টিকিট আমরা নিজেরা করে নিয়েছিলাম অনেকদিন আগে। সেই সময় কোভিডের জন্য লোকে বেড়াতে যাচ্ছিল কম। ফলে আমরা নিঃসন্দেহে কিছু সুবিধা পেয়েছি। 

 

পর্ব ১১


নাইরবি থেকে এ্যাম্বোসোলির দূরত্ব ২৭০ কিমি। ২রা জুন, ২০২২ সকাল সোওয়া দশটা নাগাদ রওনা দেওয়া হোলো মোম্বাসা রোড দিয়ে। ভারী সুন্দর রাস্তা, দুপাশের ল্যান্ডস্কেপ অপূর্ব। এই রাস্তাটি কেনিয়ার রাজধানিকে যুক্ত করেছে দেশের বন্দর শহর মোম্বাসা কে। ফলে খুবই ব্যস্ত রাস্তা, প্রচুর যান চলাচল করে, বিশেষ করে বহুচাকা বিশিষ্ট ট্রাক। 


এখানে কেনিয়ার রাস্তাঘাট ট্রাফিক সম্পর্কে দু একটা কথা বলা দরকার। সমস্ত জায়গায়, শহরেই হোক বা হাইওয়েতেই হোক রাস্তাঘাট ঝাঁ চকচকে। কোথাও কোনো নোংরা পড়ে থাকেনা। রাস্তাগুলো লক্ষ্য করে দেখলাম খুব বিজ্ঞানসম্মতভাবে তৈরী। পাহাড়ী রাস্তায় যেখানে চড়াই উঠতে হচ্ছে সেখানে আপের দিকে দুটো লেন, একটা মন্থরগতি যানের জন্য অন্যটি দ্রুতগতির যানের জন্য। ডাউনের দিকে কিন্তু একটাই লেন যেহেতু উৎরাইতে গাড়ীর গতি খুব বেশী থাকে। চালকরা বেশীরভাগই খুব সাবধানে নিয়ম মেনে চালায়। অযথা হর্ণ কেউ বাজায়না। তবু কি দুর্ঘটনা হয়না? শেষের দিকে আমরা বেশ বড়সড় দুটো দুর্ঘটনা দেখেছি। নাইরবির মতন রাজধানী শহরেও ট্রাফিক সিগনাল খুবই কম। কিন্তু তারজন্য সবাই বেপরোয়া গাড়ী চালানর জন্য যে যানজট হয়, তা নয়। যানজট যা হয় তা অধিকাংশ অতিরিক্ত গাড়ীর চাপের জন্য। দুচাকার সংখ্যা খুবই কম। আমাদের দেশের মতন এখানেও বাইক ট্যাক্সি আছে যেগুলোকে বোদাবোদা বলে। শহরের মধ্যে বা বাইরে অধিকাংশ দুর্ঘটনার পিছনে এরাই বেশী দায়ী থাকে। 


এমেলি নামের একটা ছোট শহরে ক্ষণিকের বিরতি নিয়ে গাড়ী মোম্বাসা রোড ছেড়ে ডানদিকের রাস্তা ধরল। সেও বড় সুন্দর রাস্তা। মাঝেমধ্যে চোখে পড়ছিল জেব্রা বা হরিণ পরিবার রাস্তার ধারে দাঁডিয়ে অপু-দূর্গার মতন গাড়ী চলাচল দেখছে। যাচ্ছি বিভূতিভূষনের চাঁদের পাহাড়ের উদ্দেশ্যে তাই ওনারই সৃষ্ঠ অন্য দুই চরিত্রের কথা মনে পড়ল। শেষ দশ পনেরো কিমি রাস্তা অবশ্য বেশ খারাপ। রাস্তা সারান হচ্ছে বলে বেশীরভাগ সময় পাশের মাঠ দিয়ে যেতে হচ্ছিল। ফলে প্রচুর ধুলো। কাজেই ধুলোয় মাখামাখি হয়ে অবশেষে আমাদের পরবর্তী দুরাত তিনদিনের আস্তানা Kibo Safari Camp পৌঁছে গেলাম বেলা পৌনে তিনটে নাগাদ। গাড়ী থেকে নামার সাথে সাথে হাসিমুখেজাম্বো” (hello) করিবু” (welcome) সম্বোধন, হাতে এলো সুগন্ধি মাখান গরম তোয়ালে যা দিয়ে মুখ হাত মুছে পথের ক্লান্তি ধূলো দূর হোলো। তারপর welcome drinks. Check-in formalities complete করে প্রসস্ত ডাইনিং রুমে লাঞ্চের জন্য। এই ক্যাম্পটা মাসাইমারার Loyk Mara Camp এর থেকে অনেক বড়, যদিও এটা জঙ্গলের বাইরে। তাঁবুর সংখ্যাও অনেক বেশী। ভীড়ও ভালই দেখলাম। অধিকাংশই ইউরোপীয়ান বা আমেরিকান পর্যটক। আমাদের তাঁবু এখানেও যথেস্ট আরামপ্রদ। বারান্দায় বসলেই সামনেই সেই চাঁদের পাহাড়, মাউন্ট কিলিমাঞ্জারো। চূড়ায় অল্প তূষারের ছোঁয়া। চাঁদের পাহাড় দেখেই শরীর শিহরিত হোলো। মনে পড়ে গেল শংকরের কথা। ভাবছিলাম এখানেই কোথাও হয়তো বুনিপ রয়েছে, হয়তো সে লক্ষ্য রাখছে আমাদের ওপর।


আগেই বলেছি আমার শরীর ঠিক না থাকার জন্য জর্জ এখানে শেফ কে ডেকে আমার জন্য আলাদা খাবারের ব্যবস্থা করতে বলেছিল। শেফ আমাকে বলল তাঁবুতে গিয়ে বিশ্রাম নিতে ওখানেই আমার খাবার পৌঁছে যাবে। প্রীতম আর অমতি ডাইনিং হলেই লাঞ্চ করে নিল। আমার জন্য তাঁবুতে চলে এলো গরম গরম খিচুড়ি আর আলুভাজা। তাঁবুর বারান্দায় বসে মাউন্ট কিলিমাঞ্জারো দেখতে দেখতে খিচুড়ি খাচ্ছি, জিনিষ ভাবা যায়? আনন্দেই আর খাদ্যগুণে শরীর একদম চাঙ্গা।


মাউন্ট কিলিমাঞ্জারো 


রাতে ডিনারে অবশ্য আর স্পেশাল মেনুর প্রয়োজন হয়নি। বুফে আইটেম থেকেই বেছে বেছে অল্প কিছু নিয়ে হয়ে গেলো। তার আগে আমায় দেখতে পেয়ে রেস্টুরেন্ট ম্যানেজার এসে আমার শরীরের খোঁজ নিল। পরে দেখলাম দূর থেকেই আমি কি কি খাবার পাতে নিচ্ছি সেদিকে নজর রাখছে। সেই নজর এড়িয়ে খুব ইচ্ছা থাকা সত্বেও ভাল ভাল ডেজার্টগুলো আর চেখে দেখা হোলোনা 😞


খাওয়ার পর দেখি পাশেই একজায়গায় আগুনের চারপাশে একদল মাসাই ঘুরে ঘুরে নাচছে। সেখানে একটু সময় কাটিয়ে তাঁবুতে ফেরা। এই ক্যাম্পটা যেহেতু জঙ্গলের বাইরে চারপাশে ইলেক্ট্রিক ফেন্স এখানে নিজেরা চলাফেরায় কোনো বাধা নেই। সেই রাতে অন্ধকারের মধ্য দিয়ে ফেরার সময় আকাশের দিকে তাকিয়ে জীবনে প্রথমবার Milky Way দেখলাম। তাঁবুতে ফিরে দেখি এখানেও একই ব্যবস্থা। আমরা যখন খাবার জায়গায় তখন হাউসকিপিং এর লোক এসে বিছানা করে, মশারি টাঙ্গিয়ে, কম্বলের তলায় হট ওয়াটার ব্যাগ রেখে দিয়ে গেছে। অগত্যা বিছানায় শোওয়া মাত্রই ঘুমে চোখ জুড়িয়ে এলো।


পর্ব ১২


জর্জের সাথে আগেই কথা বলে ঠিক করা হয়েছিল যে পরের দিন অর্থাৎ /০৬/২০২২, আমরা একটানা না করে দুটো আলাদা গেম ড্রাইভ করব, সকালে বিকালে। সেই মতন সকাল সাড়ে ছটায় শুরু হোলো আমাদের প্রথম সফর। কেনিয়াতে সব জঙ্গলেই গেম ড্রাইভ শুরু হয় সাড়ে ছটায় আর শেষ হয় সন্ধ্যা সাড়ে ছটায়। মাঝের সময়টুকু বন্যপ্রাণীদের একান্ত নিজস্ব 


এ্যাম্বোসেলিতে কিন্তু গাড়ী জঙ্গলের মধ্যে রাস্তা দিয়েই খালি চলবে। রাস্তার দুপাশে কিছু দেখার থাকলে রাস্তা থেকেই দেখতে হবে। মাসাইমারার মতন মাঠের বা সাভানার মধ্য দিয়ে যাবার কোন উপায় নেই। গেট পেরিয়ে খানিকটা যাবার পরই দেখি একজায়গায় দুতিনটে গাড়ী দাড়িয়ে আছে আর তার আরোহী পর্যটকরা ক্যামেরা, বাইনোকুলার ইত্যাদি রাস্তার বাম দিকে তাক করে রেখেছে। আমরাও ওখানে দাড়িয়ে গেলাম। খালি চোখে কিছুই বোঝার উপায় নেই চট করে। বাইনোকুলার আমার টেলি লেন্সে চোখ রেখে বুঝলাম যে অবশেষে ভাগ্য সুপ্রসন্ন। মাসাইমারাতে যাদের দেখা মেলেনি সেই চিতার সাক্ষাত পেলাম। একটি মা চিতা বেশ কয়েকটি ছানাপোনা নিয়ে একটা গাছের তলায় রয়েছে। বাচ্চাগুলো মাঠের মধ্যে হুটোপাটি করছে। তবে তারা এ্যাতোটাই দূরে রয়েছে যে ছবি ঠিক মতন পেলামনা। কিছু রেকর্ড শট্ নিয়ে নিলাম।


এরপর বেশ কিছু নতুন পাখীর দেখা পেলাম যেমন Long-tailed fiscal, White-bellied bustard, African Fish-eagle, Ring-necked dove, Von der de Ken’s hornbill, Black-headed heron ইত্যাদি। একজায়গায় দেখা পেলাম এক ঝাঁক কদাকার দর্শন Marabou Stork এর। 


আফ্রিকান ফিশ ঈগল 

Marabou Stork

আরও যাবার পর দেখা মিলল এক পাল বিশাল আকৃতির হাতির সাথে। এ্যাম্বোসোলি বিখ্যাত এদেরই জন্য। তবে মনে হোলো চেহাড়ায় যেমন এরা বড়, মনও খুব বড়। যতটা কাছের থেকে আমরা এদের দেখছিলাম বা ছবি তুলছিলাম সেটা ভারতে কোনো হাতির ক্ষেত্রে ভাবা যায়না। দলে একটা ছোট্ট বাচ্চাও ছিল। চলতে চলতে মাঝে দাড়িয়ে আবার সে মাতৃদুগ্ধও পান করে নিল। মাঝে জর্জ বোধহয় একটু বেশী কাছাকাছি চলে গেছিল। তখন একটা অতিকায় দাঁতাল ঘুরে দাড়িয়ে আমাদের দিকে তাকাল। বোধহয় বললনিজের অধিকারের মধ্যে থাক, বেশী বাড়াবাড়ি কোরোনা আমরাও বিনা বাক্যব্যয় করে ভাল ছেলের মতন আর এগোলামনা। 


সুখী পরিবার 



এরপর গাড়ীর গন্তব্য সিসেনু মার্সি লেক। বিশাল এক নীল জলের লেক। তার মধ্যে ঝাঁকে ঝাঁকে গ্রেটার ফ্লেমিংগো। এবং আরও কিছু জলজ পাখী।


গ্রেটার ফ্লেমিংগো 


ফেরার পথে দেখি একজোড়া White-headed vulture কোনো একটা পশুর শবদেহ ঠুকরাচ্ছে আর একদল Marabou Stork গোল করে তাদের ঘিরে সেই দৃশ্য দেখছে।


সকাল নটা নাগাদ আবার ক্যাম্পে ফিরে ব্রেকফাস্ট করে ক্যাম্পের মধ্যেই একটু ঘোরাঘুরি করে কিছু পাখীর ছবি তুলে তাঁবুতে ফিরে বিশ্রাম, তারপর স্নান দুপুরের খাওয়া সেরে আবার বেলা তিনটেয় শুরু হোলো আমাদের সেদিনের দ্বিতীয় গেম ড্রাইভ।


Zebra Crossing


পর্ব ১৩


আয়তনের দিক থেকে দক্ষিণ কেনিয়াস্থিত এ্যাম্বোসেলি ন্যাশনাল পার্ক মাসাইমারার তুলনায় অনেকটাই ছোট, মাত্র ৩৯২ স্কোয়ার কিমি। এই পার্কটির খ্যাতি প্রধানত হাতির পাল মাউন্ট কিলিমাঞ্জারোর জন্য। 


ঐরাবত 


//২০২২ তারিখে দুপুরের খাওয়া দাওয়া সেরে বেলা তিনটে নাগাদ আবার শুরু হোলো আমাদের গেম ড্রাইভ। জর্জ বলল এবার আমাদের মূল লক্ষ্য স্যাংচুয়ারীর মধ্যে এক পাহাড়, যার পোষাকি নাম Observatory Hill. যাবার পথে একদল উটপাখির দেখা পেলাম। এক জলায় দেখি বেশ কিছু হিপো খাবার সন্ধানে ব্যস্ত। তাদের পিঠের ওপর চড়ে বসেছে বেশ কিছু বক। 


জলহস্তি 

জায়গারই বিপরীত দিকে এক মাঠের দিকে অনেক্ষণ ধরে জর্জ বাইনোকুলার তাক করে কি দেখছে লক্ষ্য করলাম। জিজ্ঞাসা করায় বাইনো এগিয়ে দিয়ে দেখতে বলল এক পশুরাজ দম্পতির প্রেমের দৃশ্য। খালি চোখে দেখাই যাচ্ছেনা কিছুই। বাইনো বা টেলি লেন্সের মাধ্যমে শুধু বোঝা যাচ্ছে। আরও দেখি কিছু অন্যান্য পশু, যেমন জিরাফ, জেব্রা ইত্যাদি পশুরাজের সেই প্রেমের দৃশ্য অনেক নিরাপদ দূরত্বে দাড়িয়ে লক্ষ্য করছে।


পশুরাজের প্রেম

 অবশেষে সেই অবসার্ভেটরি হিলে পৌঁছালাম। পাহাড়ের নীচ অবধি গাড়ি গেল। বাকিটা পায়ে হেঁটে যাওয়া। ভারি টেলি লেন্স কাঁধে নিয়ে উঠতে পারব কিনা একটু সন্দেহ ছিল। কিন্তু জর্জের উৎসাহবাক্যে অনুপ্রানিত হয়ে ধীরে ধীরে উঠেই পড়লাম। জায়গাটা এ্যাম্বোসেলি লেকের কিনারায়। তাঞ্জানিয়া সীমান্ত একদম কাছেই। এ্যাতোটাই কাছে যে মোবাইলে দেশের সার্ভিস প্রোভাইডরের সিগনাল। পাহাড়ের মাথা থেকে পুরো স্যাংচুয়ারীর একটা ৩৬০ ডিগ্রি একটা ভিউ পাওয়া যায়। কিছুটা সময় ওখানে কাটিয়ে নেমে এসে এবার লেকের মধ্যেকার ফ্লেমিংগো অন্যান্য পাখী দেখতে দেখতে ছবি তুলতে তুলতে চললাম। এক জায়গায় দেখি একটা পর্যটক গাড়ী রাস্তার ধারে দাঁড়ান, তার আগে পিছে দুটো জঙ্গল রক্ষীদের গাড়ী। তারা গাড়ীর চৈনিক পর্যটকদের জিজ্ঞাসাবাদ করছে। কয়েকজন রক্ষী দেখলাম পর্যটক গাড়ীর ভিতর থেকে কিছু যন্ত্রপাতি বাজেয়াপ্ত করছে। জর্জ গাড়ীর চালকের সাথে দেশীয় ভাষায় কথা বলে চলতে শুরু করল। ওর কাছ থেকে শুনলাম চিনারা নাকি ওখানে ড্রোন উড়িয়ে চিনে লাইভ ফিড্ পাঠাচ্ছিল। কি সাংঘাতিক ব্যাপার! খুব সম্ভবত ওদের গাড়ীর চালক মারফত রক্ষীরা খবর পেয়ে এসে ঐসব ড্রোন, ক্যামেরা সব বাজেয়াপ্ত করছে। এরপর বিশাল অংকের জরিমানা ঘাড় ধরে বহিস্কার।


ইতিমধ্যে জর্জ অন্য গাড়ীর ড্রাইভারের থেকে খবর পেয়ে দ্রুত সকালে যেখানে চিতা পরিবার দেখেছিলাম সেখানে নিয়ে গেল। দূর থেকেই অনেকগুলো পর্যটক গাড়ী দেখলাম ওখানে দাঁড়িয়ে আছে। জর্জ ওখানে গিয়ে একটা ভাল পোজিসনে দাঁড় করাল গাড়ী। দেখি সেই চিতা পরিবার শিকার করে ভোজনে ব্যস্ত। এবার আর দূরে নয়, মোটামুটি কাছেই। খালি চোখেই দেখা যাচ্ছে। বেশ কিছুক্ষণ ওখানে কাটিয়ে একটা অপূর্ব সূর্যাস্ত দেখে তারপর আবার ক্যাম্পে ফিরে গেলাম।


চিতার পারিবারিক ভোজন 



পর্ব ১৪


৪ই জুন, ২০২২, আজ আবার নাইরবি ফেরার পালা। তার আগে আরেকবার গেম ড্রাইভ। আজ সকাল থেকেই আকাশ মেঘমুক্ত, ঝকঝকে। ফলে সকাল থেকেই কিলিমাঞ্জারোর চূড়া দৃশ্যমান। সূর্যোদয়ের আগেই জঙ্গলের গেট পেরিয়ে আমরা ঢুকে পড়লাম। গতকাল একটা সুন্দর সূর্যাস্ত দেখেছিলাম। আর আজ দেখলাম অপূর্ব এক সূর্যোদয়। সত্যি, রোজইতো হয় সূর্যোদয় সূর্যাস্ত, তবু প্রতিবারই দেখে মন ভাল হয়ে যায়।


নতুন প্রভাত 

আজ আর নতুন কিছু দেখলামনা। তবু জঙ্গলের মধ্যে ভোরবেলায় ঘুরে বেড়ানোর, গাড়ী করে হলেও, মজাই আলাদা। তাছাড়া, চেনা পশুপাখীদেরও তাদের নিজস্ব হ্যাবিটাটে বারবার দেখলেও আশ মেটেনা। 


এ্যাম্বোসেলিতে অধিকাংশ ক্যাম্পই জঙ্গলের বাইরে, যেমন আমাদের কিবো ক্যাম্প। ভিতরে বর্তমানে মাত্র দুটো ক্যাম্প আছে, সেরেনা ওল্ড টুকাই। ফলে এই দুটো ক্যাম্পই খুব expensive. হোটেলের কথা প্রসঙ্গে একটা কথা মনে পড়ল যেটা জানান খুব দরকার মনে হয়। কেনিয়ায় কোনো রেস্টুরেন্টেই খাবার জল দেয়না। খাবার সময়ও নয়। জল কিনে খেতে হয় এবং তার দামও বেশ ভালই। আমাদের ট্যুর প্যাকেজে সব খরচ ধরা ছিল। ফলে কোনো জায়গাতেই আমাদের মানিব্যাগ বিশেষ বার করতে হয়নি। ব্যতিক্রম হোলো শুধু জলের দাম। প্রতিটা ক্যাম্পেই চেকআউটের সময় শুধুমাত্র পানীয় জলের দামই দিতে হচ্ছিল।


কিবো ক্যাম্প 


গেম ড্রাইভ থেকে ফিরে জমিয়ে ব্রেকফাস্ট করে সাড়ে দশটা নাগাদ নাইরবির উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। আসার সময় যেহেতু শেষ কিছু কিমি রাস্তা বেশ খারাপ ছিল রাস্তার কাজ চলার জন্য জর্জ এবার তাই রাস্তা আর ধরলনা। বোধহয় অন্যদের থেকে জেনে নিয়েছিল, তাই দেখলাম কিবো ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে গাড়ী রাস্তা ছেড়ে মাঠে উঠে পড়ল। বেশ খানিক্ষণ জনশূণ্য তেপান্তরের মাঠ পেরানর পরে এক জায়গায় কিছু বাড়ী ঘরের দেখা মিলল। গাড়ী দাঁড়াতে দেখে কিছু মাসাই শিশু দৌড়ে এলো। ওদের সাথে জর্জ কথা বলে বুঝে নিল সঠিক পথে আমরা চলছি কিনা। অমতির কাছে কিছু চকোলেট ছিল সেগুলো মাসাই শিশুদের দিয়ে তাদের মুখের সেই লাখ টাকার হাসি সংগ্রহ করে আবার যাত্রা শুরু করলাম। আরও বেশ কিছুটা যাবার পর আরেকটা বর্ধিষ্ণু গ্রামে পৌঁছালাম। দেখলাম ওখানে অনেক বাড়ীতেই বিদ্যূৎ, কেবল, নেট ইত্যাদি আছে। ওখানকারই একটা চায়ের দোকানে এক যুবক চা পান করছিল। তার সাথে জর্জ কিছু কথাবলার পর দেখি ছেলেটি চা পান অসমাপ্ত রেখেই ছুটে গিয়ে দোকানের সামনে রাখা ওর মোটরবাইকে উঠে আমাদের গাড়ীর সামনে সামনে চলতে লাগল। বুঝলাম জর্জের আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি হয়েছে তাই রাস্তা চেনার জন্য এই ব্যবস্থা। বেশ কিছু রাস্তা ভাবে চলার পর যখন জর্জ আবার আত্মবিশ্বাস ফিরে পেল তখন ছেলেটিকে নগদ দুশ শিলিং প্রচুর ধন্যবাদ দিয়ে বিদায় জানাল। তারপর চেনা রাস্তা পেয়ে গাড়ী উদ্দাম গতিতে চলল নাইরবি। 


এখানে আরেকটা কথা বলি। রাস্তাঘাটে সুসজ্জিত মাসাই নরনারী দেখে ছবি তোলার জন্য হাত নিশপিশ করতেই পারে। কিন্তু আমাদের উদ্দেশ্যে জর্জের সাবধান বাণী, মাসাই নারীদের ছবি তুলতে পার কিন্তু পুরুষদের ছবি বিনা অনুমতিতে নৈব নৈব চ। হঠাৎ রেগে গিয়ে হাতের লাঠি বা বর্শা ছুঁড়ে দিতে পারে।


সুসজ্জিতা মাসাই রমণী 


নাইরবি পৌঁছান মানেই শম্পার তৈরী নতুন নতুন ভাল ভাল খাবারের স্বাদগ্রহণ করা। মাসাইমারা থেকে নাইরবি ফিরে একরাত থেকেই পরেরদিন সকালেই আবার রওনা দিতে হয়েছিল। এবার পরেরদিন রবিবার। অশোকেরও ছুটির দিন। তাই শনিবার সন্ধ্যায় বেশ জমিয়ে আড্ডা দেওয়া হোলো। পরেরদিন রবিবার আমাদের তিনজনকে নিয়ে অশোক শম্পা গেল শহরের মধ্যেই কারুরা নামের এক জঙ্গলের মাঝে একটা রেস্টুরেন্টে ব্রেকফাস্টের জন্য। কারুরা ফরেস্টের সাথে আমাদের জানা আর পাঁচটা জঙ্গলেরই মিল পাওয়া যায়। বিশাল বিশাল গাছ। অনেক জায়গায় দিনের আলোও ঠিক মতন ঢোকেনা। একটা শহরের মাঝে হওয়ার ফলে জমি শিকারিদের নেক নজর সহজেই পড়ে এই এলাকার ওপর। গত শতাব্দীর নব্বইর দশকে শুরু হয় নির্বিচারে গাছ কেটে বসতি বানান। এমনকি কিছু দেশের দূতাবাসও তৈরী হয় এই এলাকায়। সেই সময় শ্রীমতি ওয়াংগারি মাথাই নামের এক পরিবেশবিদ এগিয়ে আসেন। ওঁনার নেতৃত্বে এক আন্দোলন গড়ে ওঠে কারুরা ফরেস্টকে বাঁচানার এবং কালক্রমে এঁনারা জয়ী হন। বেঁচে যায় কারুরা। শ্রীমতি মাথাইকেও পৃথিবীর মানুষ তাদের শ্রদ্ধার্ঘ জ্ঞাপন করে। ২০০৪ সালে তিনি আফ্রিকার প্রথম মহিলা হিসাবে নোবেল পুরস্কার পান।


কারুরা ফরেস্টের রেস্তোরাঁতে অশোক ও শম্পার সাথে 

নাইরবিতে আরেকটাদিন বেশ আড্ডা মেরে ঘুরে বেড়িয়ে আনন্দে কেটে গেল। পরেরদিন সোমবার আবার আমাদের সফরের দিন। এবার যাওয়া বিষুবরেখার কাছে অবস্থিত মাউন্ট কেনিয়া।



পর্ব ১৫


৬ই জুন, ২০২২, সোমবার সকাল পৌনে আটটায় আবার শুরু হোলো আমাদের সফর। এবারের গন্তব্য মাউন্ট কেনিয়ার কাছে Ol Pejeta Conservancy. নাইরবি থেকে দূরত্ব ২০৫ কিমি। জর্জ বলল আশা করছে সাড়ে চার ঘন্টায় পৌঁছে যাবে। পথে অবশ্য আমরা নানইয়ুকিতে অল্প সময় দাঁড়াব। জায়গার বিশেষত্ব হোলো ওখান দিয়ে বিষুব রেখা গেছে। 


যাত্রার প্রথমভাগে আমরা চললাম নাইরবি-কারাটিনা রোড দিয়ে। নাইরবির উপকন্ঠে চোখে পড়ল জোমো কেনিয়াট্টা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল ক্যাম্পাস। এখনও পর্যন্ত যে কটা স্যাংচুয়ারী আমরা গেছি সবকটারই যাত্রাপথের সৌন্দর্য আগেই উল্লেখ করেছি। কিন্তু এবারের পথের সৌন্দর্য আগেরগুলোকেও ছাপিয়ে গেছে। অত্যন্ত মনোরম দৃশ্য। গাড়ী ছুটে চলেছে দ্রুত গতিতে। কেনিয়াতে হাইওয়েগুলোতে একটা ব্যাপার লক্ষ্য করেছি। হাইওয়েতে কোনো জনপদের কাছাকাছি হাম্প রয়েছে গতি কমানোর জন্য। হাম্পগুলো খানিকটা চওড়া মসৃন, বেখাপ্পা ধরণের নয়। হাম্পগুলোর ওপরে হকাররা দাঁড়িয়ে থাকে হাতে পসরা নিয়ে; মূলতঃ জলের বোতল, বিভিন্ন ফল বা হস্তশিল্প নিয়ে। যেহেতু বিপদজনক ভাবে ওরা হাইওয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকে অধিকাংশ হকারই ফ্ল্যুরোসেন্ট রঙের জ্যাকেট পড়ে থাকে, যেগুলো আমাদের দেশে ট্র্যাফিক কনস্টেবলরা বা নির্মাণ শ্রমিকরা পড়ে, যাতে দূর থেকে চট করে নজরে আসে। গাড়ীগুলোও অবশ্য জায়গায় খুব মন্থর গতিতে চলে। পথে একজায়গায় চোখে পড়ল মুড়ি বিক্রি হচ্ছে। জর্জ বলল ওদেশে মুড়িকে বলে Mowea Rice. 


বিষুবরেখায় তিনমূর্তি 

মারুয়া নামের একটি জনপদ থেকে গাড়ী ডানদিক ঘুরে নানইয়ুকির রাস্তা ধরল। আজ আকাশ খুব পরিস্কার নয়। জর্জ বলল আকাশ পরিস্কার থাকলে মাউন্ট কেনিয়া ঐখান থেকেই চোখে পড়ত। অবশ্য মাউন্ট কেনিয়া আমাদের প্রতি খুব সদয় হয়নি পরবর্তীকালেও, অল্প সময় ছাড়া। 


Mt. Kenya

পৌনে বারোটা নাগাদ গাড়ী দাঁড়াল নানইয়ুকিতে যেখান দিয়ে বিষুবরেখা গেছে সেখানে। মিনিট পনেরো ওখানে কাটিয়ে আবার রওনা দিলাম Ol Pejata দিকে। ওখান থেকে স্যাংচুয়ারী খুব একটা দূর নয়। এখানে আমাদের থাকার জায়গা স্যাংচুয়ারীর মধ্যেই Sweetwater Serena Camp. গেট থেকে খুব দূরে নয়। জেব্রা, হরিণ, কেপ বাফেলো ইত্যাদি দেখতে দেখতে আমরা পৌঁছে গেলাম ক্যাম্পে। যথারীতি, জাম্বো, করিবু, আসান্তে, সুগন্ধিযুক্ত গরম তোয়ালে, ফলের রসের পর্ব শেষ করে আমাদের তাঁবুর দিকে রওনা দিলাম। মোট ৫৭ টা তাঁবু, সবকটাই সাভানা ফেসিং। রিশেপসন্ ডাইনিং এরিয়ার বাদিকে ৪০ টা আর ডানদিকে ১৭ টা। আমাদের তাঁবুর নং হোলো ৫৭, অর্থাৎ একদম শেষ প্রান্তে। পরবর্তী কালে খেয়াল করে দেখেছিলাম যে বাদিকের তাঁবুগুলোতে সব ইউরোপীয়ান আমেরিকান পর্যটক আর ডানদিকের তাঁবুগুলোতে এশিয়ান, আফ্রিকান পর্যটক। তাই আমরা বাদিকের তাঁবুর অঞ্চলটার নাম দিয়েছিলাম পার্ক স্ট্রীট অর্থাৎ সাহেবপাড়া আর আমাদের এলাকাটা হোলো শ্যামবাজার অর্থাৎ নেটিভপাড়া।


তাঁবু ও তার অন্দর 




যাইহোক্ তাঁবুতে গিয়ে মনটা আরও উৎফুল্ল হয়ে উঠল। সামনে দিগন্ত বিস্তৃত সাভানা। দূরে মাউন্ট কেনিয়া। তাঁবুর সামনে ইলেক্ট্রিক্ ফেন্সিং। তারপর একটা ছোট পরিখা। তারপর শুরু তৃণভূমি, তখনই চোখে পড়ল একজোড়া গন্ডার সাভানায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। এছাড়াও তাঁবু অবধি হেঁটে আসার সময়ই প্রচুর পাখী, হরিণ ইত্যাদি চোখে পড়েছে। তাঁবুও খুবই বিলাসবহুল আরামপ্রদ। তাঁবুর ব্যালকনিতে বসেই দিব্যি সময় কাটিয়ে দেওয়া যায়। 


তাঁবুর বারান্দায় বসেই সময় কাটানো যায় 

তাঁবুর বাইরে রাতের দৃশ্য 

জিনিষপত্র গুছিয়ে রেখে স্নান সেরে লাঞ্চে যাওয়া হোলো। বুফে লাঞ্চ, বিশাল আয়োজন। এই প্রসংগে একটা কথা বলে নিই। কেনিয়ার সবকটা ক্যাম্পেই দেখলাম ড্রাইভার কাম গাইডরাও একই ডাইনিং হলে একই খাবার খায়। এই ব্যাপারটা বেশ ভাল লাগল। খাওয়া দাওয়া সেরে তিনটে নাগাদ শুরু হোলো আমাদের প্রথম গেম ড্রাইভ। শুরুতেই জর্জ নিয়ে গেল শিম্পাঞ্জি সংরক্ষন কেন্দ্রে। পুরো কেনিয়ায় শুধু এখানেই শিম্পাঞ্জি দেখতে পাওয়া যায়। কেনিয়ায় কোনো জঙ্গলে শিম্পাঞ্জির বাস নেই। অন্যান্য দেশ থেকে অনাথ শিম্পাঞ্জি নিয়ে এসে এখানে প্রতিপালন করা হয়। সত্যি বলতে কি শিম্পাঞ্জি সংরক্ষন কেন্দ্র মোটেই ভাল লাগলনা। কেমন যেন একটা চিড়িয়াখানা মনে হোলো। এরপর যে জায়গায় গেলাম সেখানে বারাক নামের একটা অন্ধ গন্ডারকে রাখা আছে। সে বেচারা পাঁচিলের ধারে এসে দাঁড়িয়ে থাকে আর দর্শনার্থীরা ওকে ডালপালা খাওয়ায় আর শিং দুটো ধরে আদর করে দেয়। আমার একটু কাতুকুতু দিয়ে দেখার ইচ্ছা ছিল কতক্ষণ পড়ে হাসে সেটা জানার জন্য। কিন্তু বেসিক্যালি যেহেতু ভীতু সম্প্রদায়ের লোক তাই আর সাহসে কুলালনা। প্রীতম আর অমতি অবশ্য বেশ সাহসী মানুষ। ওরা বারাককে পাতা খাইয়ে শিং ধরে নেড়ে দিল বা নিজেরা নড়ে গেল বলা ভাল। আর আমি সেই দৃশ্যের ছবি তুললাম। বারাকের আশপাশে উঁকি ঝুঁকি মেরেও ওবামা নামের আর কাউকে পেলামনা। অগত্যা আবার জর্জের গাড়িতে গিয়ে বসে পড়লাম। 


বারাক ও প্রীতম 

এবার সেই পুরান নিয়ম। আর গাড়ী থেকে নামা যাবেনা। যেতে যেতে দিগন্তে চোখে পড়ল রামধনু। সেই প্রেক্ষাপটে সাভানায় জেব্রা, হরিণ আর গন্ডার। অপূর্ব সেই দৃশ্য। বর্ননার ভাষা আমার জানা নেই। দেখা মিলল এক সাদা গন্ডার শাবক সহ আর এক কালো গন্ডারের। এখানে সব জায়গায় যে সাভানা তা নয়। মাঝেমাঝে মোটামুটি ঘন জঙ্গলও আছে।সেরকমই বেশ খানিক্ষণ জঙ্গলের মধ্যে গাড়ী চালিয়ে এক জায়গায় দূর থেকেই কিছু গাড়ী দাড়িয়ে আছে দেখে জর্জ বেশ উল্লসিত হয়ে বললঅবশেষে বুঝলাম এ্যতোক্ষণ ধরে যা খুঁজছিল তা পেয়ে গেছে। কাছে গিয়ে দেখি দুটো সিংহি আর গুটিকয়েক ছানাপোনা রাস্তার ধারেই বিশ্রাম নিচ্ছে। কাছেই একটা আধ খাওয়া জেব্রা। বুঝলাম এঁনাদেরও লাঞ্চটা ভালই জমেছিল আর তারপর একটু চোখ বন্ধ করে জিরিয়ে নিচ্ছে। বেশ অনেক্ষণ ধরে মন ভরে অনেক ছবি তুলে আবার ক্যাম্পে ফেরার পালা। ফেরার পথে অল্প সময়ের জন্য মাউন্ট কেনিয়া অবগুন্ঠন খুলে দর্শন দিল। বেশ একটা শিহরণ জাগান চেহারা ওনার। সেই দৃশ্য দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম ক্যাম্পে।


বাকিটা সিংহের পেটে 



ভরপেট খেয়ে একটু গড়িয়ে নেওয়া 


পর্ব ১৬


Ol Pejeta Conservancy আয়তন ৩৬০ স্কোয়ার কিমি। এটা একটা private nonprofit conservancy. Wildlife tourism থেকে যা উপার্জন হয় সেটা wildlife conservation এর জন্যই খরচ করা হয়। বিভিন্ন সময় এটি বিভিন্ন মালিকের হাত ঘুরেছে। মাঝে কিছুদিন আদনান খাসোগী নামের আরবের এক কুখ্যাত অস্ত্র মাফিয়ার হাতেও ছিল। 


ক্যাম্পের reception area সামনেই একটা মিষ্টি জলের ডোবা আছে যেখানে সারাদিন ধরেই পশু পাখীদের ভীড় লেগে থাকে। রাতে জায়গায় এবং প্রত্যেকটা তাঁবুর সামনেই আলো জ্বলে। লক্ষ্য করলাম বেশ কিছু তৃণভোজী পশু বিশেষ করে বিভিন্ন রকমের হরিণ, জেব্রা ইত্যাদিরা এসে আলোর মধ্যে সারা রাত বসে থাকে সারারাত শ্বাপদদের হাত থেকে বাঁচার জন্য। যেহেতু ক্যাম্পের এক প্রান্তে আমাদের তাঁবু, সারারাতই তাঁবুর বাইরে পশু দের ছোটাছুটি ডাক শোনা যায়। যদিও মাসাইমারার মতন এখানে সিংহনাদ শোনার অভিজ্ঞতা হয়নি।


৭ই জুন, ২০২২ ভোরবেলায় উঠে ক্যামেরা কাঁধে বেরিয়ে পড়লাম। সাড়ে ছটার একটু আগেই শুরু হোলো গেম ড্রাইভ। ঠান্ডার মধ্যে গাড়ী চড়ে জঙ্গলের রাস্তায় চলতে বেশ ভালই লাগে। জীবজন্তুতো একই। সবই প্রায় দেখা হয়ে গেছে এই কদিনে। ফলে জঙ্গলের রূপের দিকেই নজর বেশী। এখানে জঙ্গলটা একটু অন্যরকমের। কোথাও দিগন্ত বিস্তৃত ছোট ছোট ঘাসের প্রান্তর। কোথাও ঘাসগুলো বেশ বড় বড়। আবার কোথাও মাঝারি উচ্চতার গাছের ঘন জঙ্গল। জঙ্গলের মধ্যে কখনও দেখা মেলে জলাশয়ের, যেখানে জীবজন্তুরা জল খেতে আসে। এক জায়গায়, সাভানার মাঝে দেখি এক স্মৃতিসৌধ। এটি যে সব গন্ডার পোচারদের হাতে নিহত হয়েছে তাদের স্মৃতির উদ্দেশ্য তৈরী হয়েছে। 


শাবকসহ সাদা গণ্ডার 


জর্জ গাড়ী নিয়ে ঘুরে বেরাচ্ছে আর ওর চোখ হন্যে হয়ে খুঁজছে সেই দুটি প্রাণী যেগুলো এখনো অবধি আমাদের দেখা হয়নি, অর্থাৎ লেপার্ড আর ওয়াইল্ড ডগ। তাদের দর্শন পাওয়া কি এ্যাতো সহজ? জানিনা কি আছে ভাগ্যে। ঘুরতে ঘুরতেই চোখে পড়ল একপাল জিরাফ। গুনে দেখলাম ১৩ টা। অনেকক্ষণ ধরে বিভিন্ন ভঙ্গিমায় তাদের ছবি তুললাম। তারপর গতকালের সেই সিংহ পরিবারের কাছে আবার যাওয়া হোলো। গিয়ে দেখা গেল তারা আবার একটা জেব্রা শিকার করেছে। দুই সিংহীর একজন সেটি খেতে ব্যস্ত। অন্যজন তার এক শাবককে দুগ্ধপান করাচ্ছে। আরেকটি বাচ্চা দুষ্টুমি করছে। কি জানি কেন এই পরিবারের কর্তার সাথে আমাদের একবারও সাক্ষাত হোলোনা। অফিসের কাজে বাইরে ট্যুরে গেছে হয়তো। সিংহ দর্শন সেরে ফেরার পথে এক গন্ডার পরিবারের সাথে মোলাকাত। ক্যাম্পে ফিরে প্রাতরাশ সারতে সারতে দেখলাম সামনের জলাশয়ে একটা হাতি এসেছে জল খেতে। সেটাই পরে বেলার দিকে আমাদের তাঁবুর একেবারে সামনে। 


যুগলে 

ভোজনে ব্যস্ত 



প্রাতরাশ লাঞ্চের মাঝের সময়টা ক্যাম্পের মধ্যেই পাখীর ছবি তুলে বেরালাম। বেলা সাড়ে তিনটেয় বেরোনো হোলো সেদিনের দ্বিতীয় গেম ড্রাইভের। জর্জ তখন মরিয়া হয়ে ওয়াইল্ড ডগ খুঁজছে। তার মধ্যেই এক জায়গায় জঙ্গলের মাঝে একটা অন্য ধরণের হায়না চোখে পড়ল কিন্তু ছবি নেবার আগেই সেটা কোথাও গা ঢাকা দিল। তারপর একজায়গায় মাঝারি উচ্চতার গাছের জঙ্গলের মধ্য থেকে হঠাৎই এক পাল গন্ডারের একেবারে মুখোমুখি পড়ে গেলাম। এক এক করে তারা রাস্তার একদিক থেকে বেরিয়ে অন্য দিকে যেতে লাগল। খালি একটা বিশাল গন্ডার শাবকসহ  বেরিয়ে এসেই আমাদের দেখতে পেয়ে খুব বিরক্ত হয়ে রাগতভাবে দুপা এগিয়ে এলো। জর্জ তৎক্ষণাৎ গাড়ী অনেকটা পিছিয়ে নিয়ে গেল। ভাগ্যিস পিছনে আর কোনো গাড়ী ছিলনা। 


সেই রাগি গন্ডার 


এরপর এক জায়গায় একজন রেঞ্জারের সাথে দেখা হওয়াতে জর্জ কিছু কথা বলার পর কাছেরই একটা হিপো ট্রেলে যাওয়া হোলো। ওখানে গাড়ী থেকে নেমে সশস্ত্র রক্ষীর পাহাড়ায় হিপো ট্রেলে একটু হাঁটাহাটি করে হিপো দেখা হোলো। খানেই রক্ষীদের কাছে শুনলাম যে জঙ্গলে নাকি ওয়াইল্ড ডগ আর নেই তারা পাশের কোনো জঙ্গলে মাইগ্রেট করে গেছে। বুঝলাম যাত্রায় আমাদের আর এদের সাথে দেখা হবেনা। অগত্যা বাকি পড়ে রইল লেপার্ড। তারই সন্ধানে বেশ কিছু সময় ঘুরল জর্জ। তারপর ক্যাম্পে ফেরার পথে আবার একবার সিংহীদের সাথে অল্প সময় কাটালাম। ততক্ষণে জেব্রার প্রায় কিছুই অবশিষ্ঠ নেই। নতুন পর্যটক যারা এসেছে তাদের বেশী সুযোগ দিতে আমরা তাড়াতাড়িই জায়গা ছেড়ে ক্যাম্পে ফিরে গেলাম। 



পর্ব ১৭


৮ই জুন, ২০২২, আজ আমাদের এবারের কেনিয়া ভ্রমণের এই পর্যায়ের শেষ গেম ড্রাইভ। সত্যি বলতে কি লেপার্ড আর ওয়াইল্ড ডগ্ ছাড়া মোটামুটি অন্য সব কিছুই প্রায় দেখা হয়ে যাওয়ায় গেম ড্রাইভের আকর্ষণ ততক্ষণে অনেক স্থিমিত। জর্জও দেখলাম লেপার্ড না দেখাতে পারার জন্য হতাশ। খোঁজ পেয়েছে কোথায় যেন চিতা পরিবার আছে, সেই দিকে আজ চলল। তারপর তন্ন তন্ন করে খুঁজে চলল চিতা। সেই করতে গিয়ে বেশ কয়েকবার কয়েকজনকে ফোনও করল। কিন্তু চিতার আর দেখা নেই। এর মধ্যে অবশ্য অন্যান্য জন্তু জানোয়ার প্রচুর দেখছি কিন্তু সেদিকে আমাদের কোনো উৎসাহ নেই। আমাদের লক্ষ্য একমাত্র চিতা। অনেক ঘোরাঘুরি করেও যখন তার দেখা মিললনা, আমরা সবাই হতাশ। তখন ঠিক করা হোলো শেষ একটা প্রয়াস নেওয়া হবে, চিতা পেলে ভাল না হলে ক্যাম্পে ফিরে গিয়ে তৈরী হয়ে সকাল সকাল নাইরবি রওনা দেওয়া হবে। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আরেকবার চলল জর্জ চিতার সন্ধানে। কিছু দূর যাবার পর রাস্তার ওপরেই ওটা কে দাঁড়িয়ে আছে? রাস্তার মাঝে আমাদের দিকে তাকিয়ে। যদিও বেশ খানিকটা দূরে। আমরা চারজনেই হতভম্ব। যাকে সবকটা স্যাংচুয়ারীতে খুঁজে বেরিয়েছি এবং ধরেই নিয়েছিলাম যার দর্শন আর যাত্রায় পাবনা সেই লেপার্ড রাস্তার মাঝে পরিস্কার দৃশ্যমান। আমরা সকলেই স্তম্ভিত। আমিতো ভুলেই গেছি যে আমার হাতে ক্যামেরা আছে, অন্য দুজনেরও একই অবস্থা। এরপর জর্জ যে ভুলটা করল, আরও কাছ থেকে দেখার জন্য গাড়ীটা এগিয়ে নিল একটু। ব্যাস্, তাতে যেটা হোলো লেপার্ড বাবাজী বাঁ পাশের ঝোপে গা ঢাকা দিল। আমরা জায়গাটায় দাঁড়িয়ে গিয়ে বাঁ দিকের একটা ছোট opening এর দিকে তাকিয়ে রইলাম ঐখান দিয়েই পালাবে আন্দাজ করে। সেটা ঠিকও ছিল। ঐখান দিয়েই অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ছুটে জঙ্গলের গভীরে ঢুকে গেল। এইবারে অবশ্য ক্যামেরা তাক করাই ছিল আর burst mode চালিয়ে দিলাম শাটার। কিন্তু opening টা এ্যাতোটাই ছোট ছিল আর লেপার্ডের গতি এ্যাতো বেশী ছিল যে নিশ্চিত ছিলামনা ছবি উঠল কিনা। মুহূর্তে রিভিউ করে মনে হোলো ওঠেনি। পরে বাড়ী ফিরে ছবি প্রসেস করতে গিয়ে দেখলাম একটা ফ্রেমে ধাবমান লেপার্ডের লেজটুকু এসেছে। এযাত্রায় লেজ নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে। তবে চোখের দেখাতো পেলাম। এক্কেবারে শেষ সময়ে এসে আমাদের বিগ ফাইভ দেখা সম্পূর্ণ হোলো, কি কম কথা! 


কেনিয়ার জাতীয় পাখি LilacBreasted Roller  

Zebra



গন্ডারের গুঁতোগুঁতি 


এরপর আর কিই বা দেখার থাকতে পারে? অত্যন্ত সন্তুষ্ট চিত্তে ক্যাম্পে ফিরে ব্রেকফাস্ট সেরে স্নান করে চেক আউট করে নাইরবির পথে আবার রওনা দেওয়া হোলো। 


জর্জের সাথে তিনমূর্তি 


পর্ব ১৮


কেনিয়ার যতটুকু ঘুরলাম, পথে ঘাটে কয়েকটা অতি পরিচিত ভারতীয় ব্র্যান্ড চট করে নজর কেড়ে নেয়। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশী চোখে পড়ে Airtel, শহর, গ্রাম, প্রত্যন্ত এলাকা সব জায়গায় এই ব্র্যান্ড দেখে বেশ পুলকিত বোধ করছিলাম। Airtel কেনিয়ার অন্যতম মোবাইল service providers. এছাড়া আরও যেগুলো দেখলাম - BATA, TATA, Ashok Leyland, Bank of India এবং Bank of Baroda. রাস্তাঘাটে এই সাইনবোর্ডগুলো যখন চোখে পড়ে ভারতীয় হিসাবে বেশ গর্ব অনুভব করি।


আগামী আগস্ট মাসের তারিখে কেনিয়ায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। সেই উপলক্ষে ওদেশের রাজনীতি বেশ সরগরম। মাঝেমাঝেই চোখে পড়ছিল মিছিল। তবে মিছিলগুলো বেশ বর্ণাঢ্য। প্রচুর গাড়ী আর বাইক। গাড়ীগুলোতে প্রার্থীর ছবি। আর সাথে ডিজে বক্স। মিছিলে অংশগ্রহনকারীরা চলেছে গাইতে গাইতে, নাচতে নাচতে। কোথাও কোনো পোস্টার নেই। মাঝেমধ্যে কিছু হোর্ডিং চোখে পড়ল। তাতে ভোটপ্রার্থীর ছবি আবেদন। এই প্রসংগে জানাই যে ২০১৯ এর জনগণণা অনুসারে কেনিয়ায় আদিবাসী গোষ্ঠীর সংখ্যা ১২০, তার মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী সংখ্যার হিসাবে বড় গোষ্ঠী হোলো কিকুয়ু। দেশের রাজনীতির পরিসরটাও প্রধানত এদেরই কব্জায়। আজ অবধি সমস্ত রাষ্ট্রপতি এসেছেন এই কিকুয়ুদের থেকেই। স্বাভাবিক ভাবেই দেশের ব্যবসা বানিজ্যও প্রধানত এদেরই দখলে।


নাইরবি ফিরে দুদিন বিশ্রাম মাসাই মার্কেটে গিয়ে কিছু কেনাকাটা করা হোলো। আর নাইরবি মানেইতো শম্পার রান্না করা সুস্বাদু খাবারের সদ্ব্যবহার আর অশোক অফিস থেকে ফিরলে আমাদের সান্ধ্যকালীন আড্ডা। 


Kustom Travels এর যে প্যাকেজ আমরা নিয়েছিলাম, সেটা ইতিমধ্যেই সমাপ্ত হয়েছে কিন্তু বেড়ান শেষ হয়নি। অশোক ওদেরই মাধ্যমে গোপনে আরেকটা বেড়ানর পরিকল্পনা করে রেখেছিল আমরা আসার আগেই। আমাদের একটা আন্দাজ দিয়ে রেখেছিল যদিও। 


সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী অশোক শম্পা সমেত আমরা সবাই ১১ই জুন, ২০২২, শনিবার সকাল সাতটায় আবার জর্জের সাথে রওনা দিলাম লেক এলিমেন্টটা। এবারে অবশ্য আমরা পাঁচজন যাত্রী, তাই গাড়ীটা একটু বড়। নাইরবি থেকে দূরত্ব ১২৯ কিমি, সময় মোটামুটি আড়াই ঘন্টা লাগবে। যাবার পথে আরেকবার রিফ্ট ভ্যালির ভিউ পয়েন্টে দাঁড়ান হোলো। এর আগে মাসাইমারা যাতায়াতের সময় দুবার দাঁড়িয়েও আবহাওয়া ভাল না থাকায় ছবি নিতে পারিনি। এবারে অবশ্য অপেক্ষাকৃত পরিস্কার আবহাওয়া। ফলে খানিক্ষণ এই উপত্যকার সৌন্দর্য উপভোগ করা হোলো। তারপর আবার যাত্রা শুরু হোলো গন্তব্যর দিকে।


রিফ্ট ভ্যালির সামনে চার বন্ধু 

পথে পড়ল মাউন্ট লঙ্গটনট, একটি মৃত আগ্নেয়গিরি। এটার জ্বলামুখ  অবধি ট্রেক করে যাওয়া যায়। আমরা অবশ্য থামলামনা। পথের অপূর্ব সৌন্দর্য দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম লেক নাইভাসা। এখানকার বাফেলো মলে থামা হোলো ব্রেকফাস্টের জন্য। জাভা নামের একটা সাউথ আফ্রিকান চেন রেস্টুরেন্টে জম্পেস ব্রেকফাস্ট করে খানিকক্ষণ মলে ঘোরাঘুরি করে সময় কাটান  হোলো কারণ ওখান থেকে আমাদের গন্তব্য “Lake Elementta Serena Camp” খুব কাছেই। ওদিকে বারোটার আগে গেলে ওখানে ঘর পাওয়া যাবেনা। যাই হোক যথাযথ সময়ে রওনা দিয়ে বারোটার একটু পরেই আমরা ক্যাম্পে পৌঁছে গেলাম। এই ক্যাম্পটা কেনিয়ায় যে কটা ক্যাম্পে আমরা ছিলাম তার মধ্যে নিঃসন্দেহে সবচেয়ে আরামদায়ক বিলাসবহুল। প্রত্যেকটা তাঁবু লেকের ধারে। লেকে থিকথিক করছে ফ্ল্যামিংগো আর পেলিকান অন্যান্য জলজ পাখী। তাঁবুর আশেপাশে হরিণ ইত্যাদি ঘুরে বেড়াচ্ছে। 


Lake Elementta Serena Camp



Flamingo

একপাল পেলিক্যান্ 


এতদিনে পাঠকরা নিশ্চয় জেনে গেছেন চেক ইনের ফর্মালিটিসগুলো। মানে আমি পর্যায়ক্রমে জাম্বো,  করিবু, আসান্তে, সুগন্ধিযুক্ত গরম তোয়ালে, ফলের রস ইত্যাদির কথা বলছি। সেই সব পর্ব মিটিয়ে আমরা যে যার ঘরে থুড়ি তাঁবুতে সিধিয়ে গেলাম। স্নানটান সেরে মধ্যাহ্নভোজনে যাওয়া হোলো। এই পর্যায়ের ভ্রমণে কোনো গেম ড্রাইভ নেই। তবে খাওয়ার পরে একটু আড্ডা মেরে আমরা জর্জের গাড়িতে লেকের ধারে পৌঁছে গেলাম। বেশ খানিক্ষণ ধরে পাখীদের ছবিতোলা হোলো। তারপর বৃষ্টি নেমে আসায় তড়িঘড়ি ক্যাম্পে ফিরে আসা হোলো। আমাদের কেনিয়া ভ্রমণ প্রায় শেষপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। মনটা নবমীর রাতের মতন খারাপ সকলেরই। সন্ধ্যায় জমিয়ে আড্ডা। তারপর ডিনার সেরে ঘুম।


পরদিন ১২ই জুন, ২০২২, রবিবার। আজ অশোক শম্পার চল্লিসতম বিবাহবার্ষিকি। এটা আমরা জানতাম। সেজন্য Sweetwater Camp বসেই আমি, প্রীতম অমতি একটা পরিকল্পনা করেছিলাম কিভাবে ওদের দিনটা আমরা স্মরণীয় করে তুলতে পারি। ক্যাম্পেই আমরা দেখেছিলাম একজনের জন্মদিন এক দম্পতির বিবাহবার্ষিকি হোটেলের কর্মচারীরাই কিভাবে আফ্রিকান গান আর নাচের মধ্যে দিয়ে পালন করছে। ঐটা দেখেই মূলত প্রীতমের মাথায় আসে যে Lake Elementaita তেও আমরা এরকম কিছুর আয়োজন করতে পারি। যেহেতু দুই জায়গাতেই একই গ্রুপের ক্যাম্প, আমাদের বিশ্বাস ছিল যে এটা সম্ভব। আমার ওপর ভার পড়ল পুরো ব্যাপারটা গোপনে অর্গানাইজ করার। সেইমতন আমি ১১ তারিখ পৌঁছেই রিশেপসনে গোপনে শলা পরামর্শ করে রেখেছিল। ক্যাম্প কতৃপক্ষও এক কথায় রাজি। ঠিক হোলো ১২ তারিখ সকালে ব্রেকফাস্টের পর ওরা নেচে গেয়ে কেক নিয়ে আসবে। পুরো পরিকল্পনাটা অশোক শম্পাকে অন্ধকারে রেখে করা হয়েছে। ফলে elements of surprise একেবারে ১০০% আমাদের ব্রেকফাস্ট শেষ হবার পর এক মায়াবী সুরে গান গাইতে গাইতে নাচতে নাচতে ওরা কেক নিয়ে হাজির হোলো। শম্পা অশোকতো বটেই আশপাশের টেবিলে অন্যান্য পর্যটক যারা খাচ্ছিল তারাও খুব অবাক হকচকিয়ে গেল। শুধু আমরা তিনজন ছাড়া।  আমাদের পাশের টেবিলের যারা খাচ্ছিল তারাও আমাদের পাশে চলে এসে ছবি তুলতে লাগল। ওদের দলের এক মহিলাও নাচে যোগ দিল। ওদিকে অশোকতো লজ্জায় রাঙ্গা। যাইহোক নাচ গান শেষ হবার পর কেক কাটা হোলো। পুরো ব্যাপারটা এ্যাতো সুন্দর হোলো যে বুঝলাম আমাদের পরিকল্পনা সফল। শম্পা অশোকও বলল যে চল্লিসতম বিবাহবার্ষিকিটা ওদের স্মরণীয় হয়ে থাকবে। 


বেলা সাড়ে দশটা নাগাদ চেক আউট করে আমরা নাইরবির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। পথে লেক নাইভাসার এক প্রান্তে Elsamere নামের এক জায়গায় যাওয়া হোলো। 

এটি Born Free সিনেমাখ্যাত জর্জ জয় এ্যাডামসনের বাসস্থান মিউজিয়াম। এখানে মিউজিয়াম ঘুরে এ্যাডামসনদের ওপর একটা তথ্যচিত্র দেখে আমরা আবার নাইরবি ফিরে গেলাম।


তারপর আর একদিন বিশ্রাম নিয়ে মঙ্গলবার, ১৪ই জুন, ২০২২ মধ্যরাতে আমাদের তিন সপ্তাহব্যাপী কেনিয়া সফর সমাপ্ত করে দেশের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।


জীবন সার্থক করা এই ভ্রমণ সম্ভবই হয়তো হোতোনা অশোক নাইরবিতে না থাকলে। আর বিদেশে থাকার দিনগুলিতে আমাদের ছেটোখাট সুবিধা অসুবিধাগুলির দিকে সদাই তীক্ষ্ণ নজর রেখে গেছিল সদা হাস্যময়ী শম্পা। অনেক ভাগ্য করলে ওদের মতন বন্ধু পাওয়া যায়।


আমাদের প্রিয় বন্ধু দম্পতি 




------সমাপ্ত -----






মন্তব্যসমূহ

  1. ধারাবাহিকতা ভাবে আগে পড়েছিলাম। তবে সুচিন্তিত ভাবনার মিশেলে এবারের ব্লগ সংস্করণটা যেন মারা নদীতে পদ্ম ফুটিয়েছে। অরণ‍্য ও ভ্রমণপ্রেমীদের কাছে এটা অবশ্যই একটা সুখপাঠ‍্য হয়ে উঠবে বলেই বোধ হয়।
    সুপ্রতীপ।

    উত্তরমুছুন
  2. আগে পড়েছি। কিন্তু একসাথে গোটা লেখাটা পড়ার মজাই আলাদা। তোর লেখার হাতটা বেশ ভাল। আর ফটোগ্রাফির তো জবাব নেই। ----- উৎপল।

    উত্তরমুছুন
  3. অপূর্ব সুন্দর এক ভ্রমণ কাহিনী। প্রত্যেক মুহুর্ত অনুভব করা যায়।

    উত্তরমুছুন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি